Monday, August 4, 2014

নায়ম হন্তি, ন হন্যতে




তুমি শীতকাল দেখোনি বৃষ্টি,
অবশ্য কলকাতায় সে আর এলোই বা কবে?
এখানে যেমন করে আসে, পাঁচ মাস, ছ মাস থেকে যায় 
কখনো বা এক একটা আধ খাওয়া জীবন, 
সে শীতের গল্প করতে বড় সাধ হয় তোমাকে 
সেই অবুঝ অবিন্যস্ত সাদা কেমন প্রাণপণে জমিয়ে রাখে
কারো দিগভ্রষ্ট পায়ের ছাপ -
কেমন সে একবারও উন্মোচিত হয় না 
তবু কোলাহল তাকে অতিক্রম করে যায় বারবার, বারবার ...

সে শীতকালের চিঠিও দেখো পৌঁছবে তোমার ইনবক্সে একদিন 
ক্রিসমাসের শুভেচ্ছার তলায় হয়তো থাকবে,
কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ বা নোনতা জলের স্বাদ, 
যার একটা শব্দও আর সাবধানে লেখা নয়, 
স্কুলের ওয়াটার বটল বা চেকবই-পাশবইয়ের নীচে
থাকবে অনন্তকাল, 
অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য 
অস্পৃশ্য সেই প্রেম। 


কৈফিয়ৎ : বৃষ্টির ফোন এসেছিল একদিন,  উইতে তার সব বই খাতা কেটে দিয়েছে, শুধু অবিনের চিঠি ছাড়া। 

Thursday, May 8, 2014

For Prashant Rajan


Prashant, my friend, this is for you. 




P.S. The last two lines are from a long-forgotten poem by Subodh Sarkar (if my memory is not betraying me). 

Saturday, April 19, 2014

হন্যমান



Marquez চলে গেলেন. সত্যি বলতে আমি জানতাম ও না ওনার নব্বুই ছুঁই ছুঁই বয়েস, তার মধ্যে আবার pneumonia-য় ভুগছিলেন শেষ কয়েকটা সপ্তাহ ... (নাকি মাস? নাকি দিন?) 

শেষ যে বইটা পড়েছিলাম এখানকার Public Library থেকে তুলে, সেইটার নাম ছিলো Memories of My Melancholy Whores .. Marquez যেমন লেখেন সেইরকম-ই, খুব অদ্ভুত নিস্পৃহ একটা narrative, এবং মানতে বাধ্য হচ্ছি ৯০-এর ১৪-কে প্রেম (এর কোনো প্রতিশব্দ নেই) না পারছিলাম ঠিক করে নিতে, না পারছিলাম অগ্রাহ্য করে স্রেফ লেখাটা পড়ে যেতে.. Marquez-এর সব লেখাই আমার কাছে অদ্ভুত লাগত,  সেই যেন নিকষ কালো তীব্রতম বিষাদ থেকে একান্ত আনন্দ, সবকিছুর মধ্যেই যেন দেওয়ালের ওপার থেকে ফিসফাস শোনা যায় ... 

এই ধরো যদি একটা লোকের হাতঘড়ি কিম্বা bookshelf কথা বলতে পারতো আর তারা যদি ঘরের ঘুপচি অন্ধকারে বা চড়া দিনের রোদ্দুরেও সকলের অলক্ষ্যে লিখে ফেলতো পাতার পর পাতা নেশা ধরানো লেখা, সেরকম, ঠিক সেইরকম ... 

এই অব্দি পড়ে যদি ভেবে থাকেন, আমি তাঁর লেখা নিয়ে একটি মনোজ্ঞ আলোচনা ফেঁদে বসবো, তাহলে ভুল করছেন ... আরে আমার সব লেখা, গল্প, কবিতাই আমাকে নিয়ে, আমার বাইরে 'বেশি কিছু আমার অধিগত নয়' ... Marquez বা মালিঙ্গা  কাউকে নিয়েই একপাতা লেখার আওকাত থাকলে বসে বসে ফাল্গুনি* করতাম না, তাহলে? 

এইবারে উপরে তাকান, ব্লগের নামটা পড়ুন.. Santiago Nasar, কেডা জানেন? Marquez-er নায়ক .. যে মারা যায় বার বার বার বার করে Chronicle of a Death Foretold-এ .. যার  মৃত্যুর অনেক আগেই ঘাতকের ছুরি থেকে রক্ত ঝরতে থাকে ... 

সে, Santiago Nasar, নায়ক,
আর আমি, পাঁচু পাল, আস্ত বাল ।

কিন্তু তবুও সেই সব দিনগুলোয়, যখন লিখতাম শুরুর দিকে .. আমি-ই ছিলাম সেই, আমি-ই Santiago Nasar. তবে মরে যাওয়ার পরেও Santiago Nasar একটা গোটা গল্প লেখে ... ম্যাজিকের মতন ... 

আমিও মরে হেজে গিয়েও আবার হাত-পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দু-তিনটে সিগারেট ফুঁকে, কয়েক-কাপ কফি খেয়ে, কয়েক শতাব্দী পরে ফিরে আসছি গল্প লিখতে.. Marquez থেমে গেলেন আজকে, আমার গল্প এখন কিছুতেই থামতে পারে না ... অন্ততঃ আরেকটা ম্যাজিক দেখানোর আগে তো নয়-ই ... 


(* ফাঁকায় বসে বাল গুনি)

Monday, January 14, 2013

আমার শহর



( ভেবেছিলাম এক কাপ চা নিয়ে গিয়ে বাইরের বেঞ্চটায় বসবো, আর আয়েশ করে সিগারেট খেতে খেতে কলকাতার কথা ভাববো খানিকক্ষণ, তারপর এসে একটা পাঁচমিশেলী গল্প নামিয়ে দেবো ... বাধ সাধলো বাইরের বিচ্ছিরি কনকনে হাওয়া আর বরফ-বৃষ্টি, ইন্ডিয়ানা যে কোনোদিক থেকেই ইন্ডিয়া না সেটা আরেকবার উপলব্ধি করে ন্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে এলাম ঘরে, আর খানিক রেগে মেগেই এই চিঠিখানা লিখে ফেললাম তাকে ... কলকাতাকে) ... 

উনিশ-শো নব্বুইয়ের আশেপাশেই হবে বোধহয় সময়টা, দুলে দুলে সাধারণ জ্ঞানের বই থেকে মুখস্থ করছি জাতীয় পশু বাঘ, জাতীয় পাখি ময়ূর, দেশের রাজধানী দিল্লি - বাবা হঠাৎ আনন্দবাজার থেকে চোখ সরিয়ে বললেন, জানিস তো অনেকদিন আগে আমাদের কলকাতাই দেশের রাজধানী ছিলো ... দুষ্টু ইংরেজগুলো কলকাতা থেকে রাজধানী নিয়ে দিল্লী চলে যায় ... ওইটুকু বয়সেও সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিলো, ঠিক করেছিলাম বড় হলেই দিল্লীওয়ালাদের সাথে হেব্বি ঝগড়া করে ক্যাপিটাল নিয়ে চলে আসবো ... সেই থেকেই রোজ খবরের কাগজে আর টিভিতে খুঁজতাম, কোথায় কলকাতা টেক্কা দিয়েছে অন্য সব্বাইকে আর যেই টিভিতে বেজে উঠতো 'মিলে সুর মেরা তুমহারা', অপেক্ষা করতাম লাস্ট সিনটার জন্য ... ওই তো কলকাতা, ওই তো পাতাল রেল ... 

নব্বুই থেকে চলতে থাকলাম দুহাজারের দিকে, সাধারণ জ্ঞানের বই থেকে কলকাতা তখন ফুটবল মাঠ, মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলকে হারালে দুয়ো দিতাম ক্লাসের ধ্রুব, সৈকতদের কিন্তু সালগাঁওকরের জালে যখন বল জড়িয়ে যেতো বাইচুঙের পা থেকে, আঃ সে কি আনন্দ ... কলকাতা আফটার অল ... কেঁদেওছি খুব, সেই যে ছিয়ানব্বইয়ের সেমিফাইনাল ... এখনও চোখ বুজলে দিব্যি দেখতে পাই একটা ওয়াইড বল মারতে গিয়ে বোল্ড হয়ে গেলো তেন্ডুলকর আর বাবা চুপিচুপি ছাদে চলে গেলেন একা একা বসে থাকবেন বলে, আর একটু পর যখন মাঠ থেকে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বেরোচ্ছে কাম্বলি - গোটা পাড়া তখন অন্ধকার, অবুঝ ... 

তখনো কিন্তু কলকাতা একটা ঠিকানা-চিহ্নই, বার্থ মার্কের মতন সঙ্গে নিয়ে চলি ... বন্ধুত্ব হলো মিলেনিয়াম পেরিয়ে - সেই একদিন জমানো টিফিনের পয়সা খরচা করে উড়িয়েছিলাম এক প্যাকেট উইলস ফ্লেক, একটা ছোট্ট পুকুর পাড়ে বসে আমার প্রথম ক্ষতে হাত রেখেছিলো সেই বয়ঃসন্ধির কলকাতা। আমার দমদমের বাড়ি থেকে সেই বরানগরের ইস্কুল - 'আধ ঘন্টা কি করে ইটারনিটি হয়', শেখালো সেই শহর কলকাতাই ... 

ষোলোয় ভর্তি হলাম দক্ষিণ শহরতলির আবাসিক কলেজে, কলকাতা মানে তখন শনি-রোববারের একচিলতে ছুটি আর ব্যাগ-কাঁধে কোচিং ক্লাসে দৌড়োনো ... দৌড়োতে দৌড়োতেই চিনে ফেললাম শ্যামবাজারের মোড় - চিনলাম গোলবাড়ি, চিনলাম ফড়েপুকুরের গলিতে-ঘুঁজিতে ক্যাসেটের দোকান আর লুকিয়ে লুকিয়ে মিত্রা, প্রাচী, দর্পণা ... কোনো এক শুক্রবার কলেজ কেটে ছুটলাম 'দেবদাস'-এর কান্না দেখতে, দশকা বিশ টিকিটে কয়েক বালতি চোখের জল ফেলে যখন ফিরছি, পকেট তখন ইডেনের টেস্ট গ্যলারি ... হাঁটতে হাটঁতে সেদিন আবিষ্কার করলাম একটা অন্য কলকাতার ছবি - ধুলোবালি আর একরাশ স্বপ্ন মেখে ঘুম যাওয়া শৈশবের ছবি, আর সেই স্বপ্ন মাড়িয়ে দাঁড়ানো নতুন নতুন দেশলাই বাক্সের মতন বাড়ির ছবি ... 

তারপরের গল্প কেমন যেন আবছা সাদা-কালো ... সেই ফুটপাথে হাটঁতে হাঁটতেই চলে গেলাম পার্ক স্ট্রীট - ম্যাগ্নোলিয়ার পাশে সেই প্রথম দেখলাম থরে থরে সাজানো ডানহিল, মার্লবোরো, ক্যামেল ... অলি পাব এলো, বিফ স্টেক আর বিয়ার ... এক বান্ধবীর জন্মদিনে শিখলাম নাহুম সাহেবের পিয়ানোর মতো নকশা করা কেক ... একদিন হুট করে অ্যাকাডেমিতে গিয়ে দেখে ফেললাম 'নানা রঙের দিনগুলি' - মনে হলো বাকি জীবনটায় আর কিছু করি না করি একটা ঠিকঠাক নাটক লিখবো, সেই নাটকের প্লট খুজঁতে খুজঁতে চলে গেলাম কতো কতো জায়গায় কে জানে - সেই পুরোনো অন্ধকার রেলরোডের ধার থেকে হাঁটতে হাঁটতে রতনবাবুর ঘাট, শেষমেষ গল্প খুঁজে পেলাম একটা বৃষ্টিভেজা ফুটবল মাঠে। 

গল্পের টানেই গল্প আসে, আসে একটূ একটু বৃষ্টির ছাঁট আর নেশার রাত্রি ... ময়দানের রেসের ঘোড়াগুলোর থেকেও জোরে ছুটতে থাকে ফুরোতে না-চাওয়া শহরের গল্প, আর হাফ-ওপেন স্কাই খালাসিটোলার ছাদে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় মুখগুলো একটা একটা করে ... 

আমার শহরের গল্প সেইখানেই আটকে গেছে, আমিও ...  মাস ছয়েক পরের এক রোববারে লুফতহান্সায় চড়ে পাড়ি দিই মুম্বই আর তার এক বছর পরে আর্ধেক পৃথিবী দূরে আম্রিকার শহরতলি ... কলকাতাকে দূর থেকে দেখি, আনন্দবাজার পড়ে এখনও উত্তেজিত হয়ে উঠি ... হঠাৎ কোনো খবরে পিঠ চাপড়ে দিতে ইচ্ছে করে কাউকে হয়তো ... সিনেমার মতন দূর থেকে হাল্কা হাল্কা শহরের গলা কানে আসে, সেই ছোট্টবেলার কারখানার ভোঁ, এরোপ্লেনের আওয়াজ, 'চাষীভাইদের বলছি' আর সন্ধ্যে সাতটার বাংলা খবরে মস্ত টিপ পড়া সেই মহিলার গলা ... 
গোদার বলেছিলেন না, 'সব গল্পেরই একটা শুরু, শেষ আর মধ্যিখান থাকে - হয়তো তারা পরপর আসে না' ... আমার শহরের গল্পেরও নিশ্চয়ই আরেকটা  শুরু লুকিয়ে আছে কোথাও, বা একটা অন্যরকম মাঝের পাতা ... 
অপেক্ষায় আছি, থাকবো সারাজীবন ... 






Tuesday, January 17, 2012

তারানা




                   বেশ ছোটোই ছিলাম তখন, একটা গানের বইয়েই ওনার ছবি দেখি - শেষ বয়সের নজরুল ইসলাম, ততোদিনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন - কথা বলার ক্ষমতাও... ছবিটায় কোনো একজন আত্মীয় বোধকরি নজরুলকে কিছু একটা খাইয়ে দিচ্ছেন চামচ চামচ, আর বৃদ্ধ কবি জবুথবু হয়ে বসে তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার দিকে - অপার্থিব একটা দৃষ্টি, খুব জোর ভয় পেয়েছিলাম ... আর জানিনা কেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনি বইয়ের কথাগুলো, উনি তো কবি - আর তাও এতো বিশাল বড়ো বিখ্যাত কবি - তিনি নিরুত্তর হয়ে ছিলেন জীবনের শেষ তিরিশটা বছর? ছবিটা কি করে যেন অনেকদিন মনে ছিলো, মাঝে মাঝে ফিরে আসতো অদ্ভুত সময়ে - তারপর সেই বইটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়, আর দেখিনি কখনো, সেই ছবিটাও ঝাপসা হয়ে হয়ে প্রায় মনেই পড়ে না এখন, শুধু অনেক অনেকদিন বোবা হয়ে থাকার পর যেদিন খুব ইচ্ছে করে দেওয়ালে, মাটিতে, জানলার শিকে মাথা ঠুকতে, খুব পড়ে পড়ে গোঙাতে ইচ্ছে করে যেদিন - সেই ছবিটার থেকে একজোড়া অপার্থিব চোখ আমাকে দেখে ... আমি জ্ঞান হারাই।


                             নাঃ, গান আমার গলা বা হাত কোনোটাতেই কোনোদিন আসেনি, নজরুলের লেখাও সিলেবাস আর শ্যামাসংগীত বাদ দিলে খুব একটা যে পড়েছি বা শুনেছি এমনটা নয় - অতএব এই গল্পটা এদের কাউকে নিয়েই নয়। আমার যখন বয়েস এই ছয় কি সাত, বাবা-মা খুব আশা করে আমাকে গান শেখাতে শুরু করে, আমাদের পাড়ার এক গানের দিদিমণি, গীতিকাপিসি - রোববার সকালে আসতেন, মাথার ঘাম পায়ে ও অন্যত্র ফেলে আমাকে সারেগামা অব্দি শিখিয়েছিলেন - আরেকটু হলে একটা গোটা রবীন্দ্রসঙ্গীতও নাকি শিখে ফেলতাম - শেষমেশ মাস খানেকের গৃহযুদ্ধের পরে বাপমা ও গানের পিসিমণি রণে ভঙ্গ দেন, আমার কপালে জোটে দুখানি তবলা ও মানিককাকু নামক এক সদাহাস্য উদ্ভ্রান্ত তবলা-পিতেমো ... এতদিন পর স্বীকার করতে বাধা নেই, তবলাজোড়াটাকে যে খুব ভালোবেসে বাজাতাম এমনটা একদমই সত্যি নয়, আমার সেই মুখচোরা ভীতু ছোটোবেলায় ওই নিরীহ নির্জীব দুটো জিনিষই ছিলো আমার স্ট্রেস রিলিভার। বাবা প্যাঁদাক, মা বকুক কি স্কুলের মৃত্যুঞ্জয় স্যার বেতের বাড়ি দিয়ে আমার বিপ্লবী পোঙা লাল করে দিক - নির্বিরোধে মার খেয়ে আমাকে সঙ্গ দিয়ে যেতো ওরা। দিব্যি চলছিলো আমাদের এই মিথোজীবিতা, তবু ক্লাস নাইন না টেনে উঠতে উঠতে লোকজন বুঝতে পারে, বছরের পর বছর ধরে আমার অসম্ভব নিষ্ঠা সত্ত্বেও যেভাবে ফুলঝুরির মতন প্রতিভা ফোটা উচিৎ ছিলো তার কিছুই হয়নি। একা একা তো দূরের কথা, ঘ্যানঘেনে অতুলপ্রসাদীর পাশেও আমার বাজনা যথোচিত পৌরুষ দেখাচ্ছে না।তারপর যা হয় আর কি, মানিককাকুর চাকরি সপ্তাহখানেকের মধ্যেই যায়, কোনো একটা বিকেলে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় বরানগরের একটা পুরোনো পাড়ার একটা গলির মধ্যে একটা বেশ পুরোনো বাড়িতে ... উত্তর কলকাতার বনেদী বাড়ির কথা ঠিক যেমনভাবে গল্পে লেখা হয়, তেমনি - প্রায় ভেঙ্গে যাওয়া দরজা ঠেলে ঢুকলে একটা ছোট্টো শ্যাওলা পড়া উঠোন - পাশে একটা কলতলায় জমে থাকা এঁটো বাসনকোসন, মাছের কাঁটা, ছড়ানো ছেটানো ভাত আর তাই নিয়ে কয়েকটা কাক আর বেড়ালের জমিদখলের ঝগড়া। একটু কান পাতলে শোনা যাবে একতলার ভাড়াটেদের বাড়িতে একটু আগে শুরু হয়েছে বিকেলের সিরিয়াল আর পাশের সরু গলিটায় কোচিং ক্লাস কাটা একজোড়া সাইকেল আর দমকা দমকা হাওয়ার মতন চাপা গলার খিটিরপিটির ... তিনতলার দরজায় বেল একটা আছে বটে, কিন্তু তার ব্যাটারি সদ্গতি পেয়েছে বেশ কিছুকাল আগেই, মিনিট পাঁচেকের অধৈর্য্য কড়া নাড়ার পরে হাসিমুখে দরজা খুলে দাঁড়ালেন তিনি - বয়স সত্তর-পচাঁত্তর, একমাথা পাকা চুল আর মুখে কয়েকটা বসন্তের দাগ ... আমার বলরাম দাদু ...  আমার আজকের গল্পের নায়ক ...

"তখন আমার বয়স প্রায় তিরিশ ছুঁই ছুঁই, একদিন ফ্যাক্টরী থেকে সাইকেল চালিয়ে ফিরছি - এদিকে কলকাতায় তখন নকশালদের তাণ্ডব, হাওয়ায় জোর খবর, বরানগরের কাছে সেদিন নাকি অ্যাকশন হবে মাঝরাতে, আমি তাড়াতাড়ি সাইকেল চালিয়ে ফিরছি, হঠাৎ দেখি সৎচাষীপাড়ার মোড়ে কারা যেন দাঁড়িয়ে, আমি তক্ষুনি সাইকেল উলটোদিকে ঘুরিয়ে প্রাণপণে চালিয়ে দিয়েছি ফ্যাক্টরীর দিকে - দশ পা যেতে না যেতে একটা রড এসে লাগলো পায়ের গোড়ালিতে, চেয়েছিলাম ফুটবলার হবো - হয়ে গেলাম তবলচি " 
                          দাদু রোজ দুপুরে আফিঙ খেতেন, কাজের লোক কাজ টাজ করে দরজা খোলা রেখেই চলে যেতো, আমি ক্লাস শেষ করে নিউ তরুণের গলিতে ঢুকে সিগারেটে দুটান দিয়েই দৌড়ে দৌড়ে চলে আসতাম দাদুর কাছে তবলা শিখতে, চোখ বোজাই থাকতো, গলার আওয়াজ পেলে বলতেন - 'চ নিয়ে চ দেখি, বসি একটু বাইরের ঘরে' ... আমি স্কুলব্যাগ থেকে গল্পের বই বের করতাম, আর দাদু আপনমনে, যেন নিজেকেই শোনাচ্ছেন এই ভাবে শুরু করতেন গল্প - আমি যে সব শুনতাম আর শুনলেও যে রোজ নতুন কিছু পেতাম তা নয়, তবু এই চলতো বেশ খানিকক্ষণ - যতক্ষণ না আফিঙটা একটু নামে, তারপর দেওয়ালের ফাঁকফোঁকর ধরে ধরে রেওয়াজের ঘরে যেতেন তিনি - আমি খুব সাবধানে একজোড়া পুরোনো বায়াঁ-তবলা বের করে আনতাম চৌকির তলা থেকে। চোখ তখনো বোজা, পোষ্যের গায়ে যেভাবে সস্নেহে হাত বোলায় অন্ধ ভিখারী, ঠিক সেইরকম উপায়হীন আদরে দাদু খানিকক্ষণ ছুঁয়ে থাকতেন তবলাজোড়া - তারপর আস্তে আস্তে বোল ফুটতো ম্যাজিকের মত, আমি চুপ করে শুনতাম ঘন্টার পর ঘন্টা ; একতলার টিভি - পাশের বাড়ির ঝিয়ে-বৌয়ে ঝগড়া - গলির মুখে কোচিং কাটা প্রেম সবকিছু আস্তে আস্তে কোথাও যেন হারিয়ে যেতো, সেই তেহাই, রেলা, টুকরার মাঝে আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামতো সেই শহরতলীর গলিতে ... 

                           রোজ দুপুরে নেশা করতেন বললাম নাকি? না না রোজ করতেন না, মাসের পয়লায় বড় মেয়ে আসত টাকী থেকে, সেদিন আমাদের মাইনে দেওয়ার আর রশিদ নেওয়ার দিন - সই করতে পারতেন না দাদু, টাকা গোনার ক্ষমতাও ততোদিনে নেই, ফ্যালফ্যাল করে জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকতেন তিনি - সেদিন গল্প আসত না, তবলা বের করে সামনে রাখলে ভয়ে ভয়ে বাজাতেন দু তিন ফেরতা, তারপর হঠাৎ করে চুপ করে গিয়ে বলতেন, 'বাপ-জ্যাঠায় গোঁড়া বামুন ছিলো, খোজার কাছে শিখতে দিলে না - না হলে আজ টাকাটা নিতে হতো না রে দাদুভাই' । আমি মাথা নিচু করে মন দিতাম বায়াঁ তবলাটার দিকে, উঠে যাওয়া গাবটাকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে বাজিয়ে যেতাম সদ্য শেখা ঝাঁপতালের কায়দাটা ... তার কিছু দিন পরে রেওয়াজ ঘরের দেওয়ালে একটা দৈনিক বসুমতীর কাটিঙ খুঁজে পেয়েছিলাম, হ্যাঁ আমার দাদুর নামের আগে একটা পন্ডিত উপাধিও ছিলো আর সেই রংচটা ছবিটায় দাদুর পাশে ছিলেন আর কেউ নয়, স্বয়ং বিসমিল্লাহ খাঁ ... 

                   আমার মাধ্যমিক চলে আসে, খবরের কাগজে নাম তোলার তাগিদে ছেড়ে দিই সবকিছুই, বরানগরের সেই গলিতেও আর যাইনা প্রায় একযুগ - তারপর হস্টেল, কলেজের পড়া ... তবলা আর আমার ছাড়াছাড়িটাও হয়ে যায় আমার অজান্তেই। বছর দুয়েক পরে সে পাড়ায় গিয়ে জানতে পারি দাদু বাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন অনেককাল , এখন ছোটো মেয়ে আর জামাইয়ের সাথে থাকেন অন্য পাড়ায়। আস্তে আস্তে অনেক বড় হতে থাকি আমি, আর পন্ডিত বলরাম মুখুজ্জে সেই রংচটা পেপার কাটিঙের মতোন হারিয়ে যান কোথাও একটা - 

                              দু হাজার ছয় কি সাত সাল হবে সেটা, একদিন বিকেলে পাড়ায় ঘুরছি একা একা, হঠাৎ পাশের পাড়ার চায়ের দোকানে দেখি শালমুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছেন তিনি - চিনতে পারলেন সঙ্গে সঙ্গেই, চা খাওয়ালেন, গল্প করলেন অনেকক্ষণ - তারপর বললেন, ' আজকাল বড়ো হাত কাপেঁ জানিস দাদুভাই, বাজাতে পারি না - কিন্তু মনে মনে এখনো রোজ রেওয়াজ করি, তারানার সময়ে একটু জিভ জড়িয়ে যায়, না হলে এখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ... ' 

                             দাদুর কোনো কথাই কোনোদিন শুনিনি আমি, তবলাটাও বশ মানেনি কোনোদিনই - তবু, এখন যখন অনেক অনেক দিন একটাও লেখা বেরোয় না হাত দিয়ে, প্রত্যেকটা শব্দ প্রত্যেকটা লাইন আমার দিকে আঙ্গুল তুলে হাসে - সেই বোবা দিন রাত্রি গুলোতে আমিও একটা শাল মুড়ি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই অনেক দূরের অন্য পাড়ার একটা চায়ের দোকানে, সেই চেনামুখ গুলো দেখতে পাই আশেপাশে - আমার হাত কাঁপে, লিখতে পারিনা একটা শব্দও, তবু মনে মনে ভেবে ফেলি হাজার হাজার গল্প - শুধু তারানার সময়ে একটু জিভটা জড়িয়ে যায়, এই যা।


                             

Saturday, October 1, 2011

অন্য পুজো (আজ্ঞে না, এটা আনন্দবাজারের কলাম নয়)


শুরুতেই বলে রাখি, আজ থেকে কলকাতায় পুজো, মানে পুজো সব জায়গাতেই, কিন্তু যাবতীয় হুড়ুদ্দুম সব আমার শহরে - আর বলাই বাহুল্য যারা পুজোয় কলকাতায় থাকে তারা ঠাকুর দেখে, ক্যাপ ফাটায়, বেলুন ফোলায়, ফুচকা-চাউমিন-এগরোল ও আরো হরেকরকম  'স্ট্রিট ফুড' খায় এবং বন্ধুবান্ধব ও বয়স থাকলে প্যান্ডেল প্যান্ডেল ঘুরে 'অসুব্যতা' করে বেড়ায় ... আমার, বলাই বাহুল্য , সেসব হুন্ডী কপালে জোটার সিন নেই... বয়েস বেড়ে বেড়ে বার্ধক্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম, বন্ধু বান্ধবরাও কে কোথায়  - আর কলকাতা তো এখন দীর্ঘশ্বাসের নামান্তর !

অতএব, আসুন এই চূড়ান্ত ডিপ্রেশনের মুহুর্তে অন্যদিকে ফোকাস মারি - একটা অন্য পুজোর গল্প, আমার শহরের বাঁশবন্দী পুজোপাগল লোক আর ১৫ টাকার মাটন বিরিয়ানির গন্ধকে সাইড কাটিয়ে, বার দুয়েক চটি আর মানিব্যাগ খুইয়ে আর মেট্রোর মাস এক্সোডাস সামলে আসুন নেমে পড়ি রবীন্দ্র সদনের কাছে কোথাও - নন্দনের বাইরেটায় চলুন, এই অক্টোবরের শুরুতে ওইদিকটায় বেশ ভালো হাওয়া দেয়, আর এই গণ-হিস্টিরিয়ার মধ্যেও একটু বসা যায় নিরিবিলি আড্ডার মেজাজে, চা-সিগারেটের দোকান দেখে একটা ভালো জায়গা নিয়ে নিই - আলো ক্রমে  নিভে যাক ... আসুন আমরা পর্দা তুলে উঁকি মারি পিন্টুদার ঘরে ... 

আচ্ছা পিন্টুদা কিন্তু পাশের পাড়ার পিন্টুদা নয়, মানে আসলে পিন্টুদা কেউ নয় - অথবা পিন্টুদা আমার মতন অনেকজন ...

পিন্টুদার বাড়ি মা দুগগার থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পরে, সেখানেও অবশ্য মা তার ছানাপোনা দের নিয়ে ফি বচ্ছর এগজিবিশন দিতে আসেন, সাধারণতঃ হপ্তাখানেক পরে (না-বিশ্বাসীদের ধারণা মহিলা ও তার বৃহৎ আনপ্ল্যানড ফ্যামিলি সেই গঙ্গায় ডুব মারেন আর এই অতলান্তিকের কোথাও ভেসে ওঠেন, তবে তারা এসব কথা প্রকাশ্যে বলেন না) ... এবং এই বিশাল জার্নির ধকলেই হোক বা অন্য কোনো কারণে, এখানে তার জৌলুষ পোস্ট-ইলেকশন সিপিএমের ন্যায় - আদেখলা বাঙ্গালী ছাড়া কদর করার লোক মেলা ভার ... তো সেই পিন্টুদার পাড়ার পুজোই আজকে আমাদের চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ! 

পিন্টুদাদের পুজো একদিনে হয়, মানে সকালে ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়, বেলার দিকে সপ্তমী অষ্টমী ঘেঁটেঘুঁটে সন্ধ্যের দিকে সন্ধিপুজো ও সিডি প্লেয়ারে কিঞ্চিৎ ঢাক ডট এমপিথ্রি হয়ে বিজয়া কোলাকুলি করে ডিনার - একটা ছোট্ট চার্চে পুজো হয়, শ-দুয়েক লোক মিলেমিশে হইচই করে পিএনপিসি করে দিব্যি কেটে যায় বিলেটেড পুজোদিবস! পিন্টুদা এখানকার একজন কাঠাঁলী কলা, সর্বঘটে তো আছেনই ... আরো এখানে সেখানে 'এসেছে শরৎ হিমের পরশ' করে বেড়াচ্ছেন গত বছর দুয়েক, উনি বেশ কাজের লোক, ্সকালে খিচুড়িতে খুন্তি নাড়েন, বিকেলে কবিতা পড়ে শোনান আর পুজোর আগের রাত্রে প্যাণ্ডেলে পেরেক ঠোকেন - এবং এসবের মাঝে টুক করে ধুনুচি নাচের সময় কোমর দোলাতে আর ভিড় দেখলেই গলায় আঁতেলসূচক ক্যামেরা ঝোলাতে ভোলেন না কিছুতেই, সেসব করেটরে একসময় চার্চ খালি হয়ে যায় - চেয়ার টেবিল তুলতে লোক পাওয়া যায় না কিছুতে, পার্কিং লটটাও ঘুমিয়ে পড়ে আস্তে আস্তে , একটা বড়ো ইউ-হলের পেছনের অন্ধকারে মা দুগগার পাশে বসে বাড়ি ফিরে আসেন পিন্টুদা, আসছে বছর - আবার হবে ... হবে তো? 

পিন্টুদার অ্যালবামে আটচল্লিশ ফুটের ঠাকুরের ছবি নেই, অষ্টমীর দিন ম্যাডক্সের কথা ভেবে হাসিও পায় না সপ্তাহখানেক পরে, আর নাঃ - পুজোয় নতুন জামার ইচ্ছে এতোদিন একটা ধুলোয় ঢাকা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি হয়ে কোথায় চলে গেছে কে জানে! তবুও এই বয়সেও বেশ ইচ্ছে হয় জানেন, গ্যারাজের জঞ্জালের স্তূপটাকে একটু সরিয়ে যখন দূর্গাঠাকুরকে রেখে চলে আসতে হয়, একবার টুক করে একটা প্রণাম করতে - 

'রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো এবার যাওয়ার আগে ...
... 
যাওয়ার আগে যাও গো আমায় জাগিয়ে দিয়ে ' 


Thursday, April 7, 2011

অ্যাই ঘুম ...



ঘুমটা ভেঙে গেলো, কটা হবে? সকাল চারটে কি পাঁচটা - ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না - মোবাইলটা হাতড়াচ্ছিলাম, পেলাম না অন্ধকারে - জানলায় ব্লাইন্ডসের ফাঁক দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যাচ্ছিলো - তাতে বুঝলাম 'আলো ক্রমে আসিতেছে', আলো এসেছিলোও হয়তো - হয়তো আমিও হাত বাড়িয়েছিলাম কিছু খুঁজতে, মনে নেই - মনে নেই কেন ঘুমের মধ্যে গুটিয়ে গেছিলাম নিজের মধ্যে - তারপরেও যে কীসব হয়ে গেলো  -  আজ সকাল থেকেই নিজেকে খুঁজছিলাম - রাস্তার ধার থেকে কুড়িয়ে পেলাম এই মিনিট দশেক হলো, ঘরে ফিরলাম - এক কাপ চায়ের সাথে কয়েক চামচ দুঃখবিলাসিতা - লেখার কথাটা ঠিক তক্ষুনি মাথায় এলো - মনে পড়লো কাল, পরশু আর এরকম কয়েকটা দিন আমি তন্নতন্ন করে ঝোপেঝাড়ে, ডায়রিতে আর আঙ্গুলের ফাঁকে কি খুঁজছিলাম -

যখন ছোট ছিলাম, জানতাম মা ঘুমোতে যায় রাত বারোটারও পরে - আর ওঠে সেই কাকভোর - চারটে, সাড়ে চারটে - গাছে জল দিতো, ঠাকুরঘরে একটা মিষ্টি ধূপ - আর চান করে আসতো নতুন জলে, আমার ঘুম ভেঙ্গে ওঠা মানে আমার ছোট্ট ঘরটায় মা-মা গন্ধ আর এককাপ চা - আমি ঢুলতে ঢুলতে গজগজ করতে করতে কোচিং ক্লাসে যেতাম আর ভাবতাম, মা পারে কি করে? - মা বলতো মায়ের ঘুমটা নাকি মা আমাদের ভাইবোনের চোখে দিয়ে দেয় রোজ শুতে যাওয়ার আগে - কোচিং ক্লাস শেষ হয়ে গেলো, ছোটোবেলাও - আমি শপিং মল শিখলাম - সাইবার কাফে শিখলাম - রাস্তা পেরোতে শিখলাম হাত না ধরে আর একদিন হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে বুঝলাম আমিও পারি, মায়ের মতন - রাত্রে দু-তিন কি বড়ো জোর চার - আমি কিন্তু কাউকে দিইনা আমার ঘুমটুকু - তাও পেরে যাই -

এদেশে এখন আড়াইটে মানে দেশের বারোটা - মাকে ফোন করি অফিস থেকে বেরিয়ে - কোনোদিন তিনটে, চারটেও হয় এক একদিন - মা একবার রিং হলেই ধরে - কখনো টিভির আওয়াজ পাই - কখনো মা পত্রিকার পাতা ওল্টায় - বাবার যেদিন বুকের জল জমেনা, সেদিন খুব ঘুমোয় নাকি - অন্যদিন ... সে গল্প মা বলে না কখনো - বরং মা আমাকে সেই ট্যাক্সিওলার গল্প শোনায় যে মাকে মাত্র দুশো টাকায় রোজ নিয়ে যায় - বা সেই ডাক্তারের যে নাকি বলেছে বাবাকে ভালো করে দেবেনই এইবার - আর সেই আমাদের না হয়ে ওঠা বাড়িটার কথাও বলে, সেই যে সেই বাড়িটা - যেটার আর কিছু থাক না থাক একটা সুন্দর ঠাকুর ঘর আছে আর মায়ের জন্য একফালি একটা বাগান - "এবারের ডালিয়া ফুলগুলো খুব সুন্দর হয়েছে জানিস তো?" - আমি শুনে যাই - মা বলে - বলেই যায় - আমার তারপরে কোনোদিন ক্লাসের তাড়া পড়ে যায়, কোনোদিন লাঞ্চটাইম - কখনও রাস্তা পেরোতে হবে বলি শুধু - মা ফোনটা রেখেও খানিকক্ষন জেগে থাকে - বাকি কথা গুলো মনেমনেই শেষ করে নেয় বোধহয়, কে জানে? - আমাদের চোখ ছুঁয়ে রোজ রাত্রে কতকিছু চলে যায় - মায়ের আঙ্গুল আর ঘুম দিয়ে যায় কিনা আমি সত্যি জানিনা,শুধু জানি মা পারে, শুধু জানি আমাকেও পারতে হবে - না হলে হবে কি করে?

বিকেলের দিকে ঠিক যেই আলোটা নিভে আসে, আমি ঘরে ফিরি - অন্ধকারকে যে খুব ভয় করে তা কিন্তু নয় - তবুও - এসে আমি এটাসেটা করি , কোনোদিন রান্না, কোনোদিন পড়াশুনো - ওকে জড়িয়ে শুয়ে থাকি কোনোদিন, কোনোদিন অকারণে খানিকক্ষণ কেঁদে নিই , রাত্রে একসময় এ শহরের সবকটা আলো নিভে যায়, ও ঘুমিয়ে পড়ে, ডুবে যায় আমার মধ্যে- আমি রাত্রির দিকে তাকাই - জানলার সামনে যে নদীটা , তার ওপাশে অনেক অনেক আলো - যেন সেই 'রাস্তার ছোটো ছোটো গর্তে জমানো আমাদের চোখের জল' - নদীর ওপার থেকে সেই অলৌকিক ঘণ্টাটা আমায় ঠাট্টা করে যায়- উঠে পড়ি আমি - কানে কয়েকটা স্বপ্ন ভেসে আসে - ফোনে মায়ের গলাটা এত আবছা শোনায় যেন ফিসফিস করে কেউ কিছু বলছে - আর কেউ জানতে না পারে যেন - আর তক্ষুনি আমাদের ধরে থাকা আঙ্গুল  ছাড়িয়ে, ওই জানলার ব্লাইন্ড পেরিয়ে, ওই হাজামাজা নদী পেরিয়ে - রাত্রের ঘন্টাকে ভেংচি কেটে উড়ে চলে যায় আমার ঘুম-আমি ঊঠে বসি আর খুঁজে বেড়াই ওকে - খুঁজতেই থাকি -

অ্যাই ঘুম, ফিরে আয়! আয় বলছি ! এক্ষুনি !

Tuesday, February 15, 2011

আমার বুকের 'পরে

[ আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই ! -
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে ! -

নির্জন স্বাক্ষর – জীবনানন্দ দাশ ]

 
 

তারপর রাত্রি নেমে আসে,
    কয়েকটা শব্দ এলোমেলো হয়ে লেগে থাকে
কপালে, চিবুকে ... কয়েকটা তারও নীচে ...
কয়েকটা শব্দ পাক খেতে খেতে উড়ে চলে যায় 
                     বনে, বনান্তরে ...
ছাদের তার আটকে যায় কয়েকটা,
আর ক্যানভাস ফুটো করে কবিতারা নামে এ শহরে ...
         কয়েকটা শব্দ আমরা শুনতে চাইনি কোনোদিন-ই ... 
আর কয়েকটা লিখতে পারবো না বলে,
    স্নানের জলে ধুয়ে ফেলতে চেয়েছি গত রাত্রের ভালোবাসাবাসি ...

 তারও পর স্বপ্নেরা ক্লান্ত হয়,
      শব্দেরও প্রয়োজন ফুরোয়,
আমি ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসি,
রাত্রি তখনও নামে, নামতেই থাকে 
      একজোড়া ঘুমন্ত চোখে ...
আমি তাকাই তার দিকে আর
   না দেখা কয়েকটা স্বপ্নের খোঁজে ঝাঁপ দিই প্রাণপণ 
আর ডুবতেই থাকি তার বুকে ...
   আজীবন জমে থাকা শিশিরের জলে ...







Saturday, January 15, 2011

Inbox (1)

Onekkhon hoye gelo, phone-o korle na ekta, chithi tar-o uttor nei .. Tumi jano aami sei sokal theke mail khule bose aachi ei elo, ei elo kore, ekta kore notun mail asche ar heartbeat du-ekta kore miss korchh aami, ar dekhchi sei kon travel site-er biggyapon nahole social network-er nemontonno .. rege mege shuyei porlam kombol tene .. ghum-ta asbe asbe korche, emon somoy hothat kemon jeno bhoy korlo jano? sei dube jawar bhoy-ta .. shwash-kashto holo khub , aami dhormoriye uthe computer-ta bandho korlam, ah ! ekta cigarette, ekta ...

Aamar boyes takhon katoi ba hobe, aat ki dosh, parar pukure ar sob bacchader sathe hoihoi kore snatar shikhchi .. oder modhye sobtheke paka chilo Laltuda, o-i tokhon amar captain, aami or ekonistho chyala .. ekdin snatar katchi- amader trainer ektu dure, Laltuda bollo 'cho ke aage pukur cross kore dekhi' .. khub jore snatrachhi... hothat majhpukure ese kemon jeno dom furie gelo, dekhlam haat-pa kicchu narate parchi na - ar dube jachi barbar kore, chitkar korlam- gola diye awaj berolo na .. chokher samne shudhu sobuj jol ar majhe majhe bheshe uthle dekhchi Laltuda oipare, trainer khokakaku takhon-o onyo bachhader bhasa shekhacche - gyan ferar por shunechilam aami naki dubei jetam sedin, pukurer oikhane naki ekta masto baro kuyo chhilo, tai keu oidiktay jeto na ... porer din theke ar oi pukure jaini ... asambhob bhoy korto jano .. ekhon-o majhe majhe sei bhoy-ta kottheke fire aase, sei sobuj jol ar dure , anek dure bakira - keu amay dekhte pacche na ..

Boyos bere gelo, pukur-tay ar aajkal keu snatar shekhe na, buje geche kina tai ba ke jane .. Khokakaku-o ekdin bhorbela onek durer ekta dighee-te snatar katte chole gechen amader paare fele rekhe ... ar aami sapto-sagor periye chole esechi kanch-dhaka aquarium-e, ekta chotto nol diye majhe majhe burburi kete oxygen aase, ar dhakna khule ektu khabar, ar aami ek-kone konomote katiye diy hele-jawa ritu-chokro .. sukhei thaki, baro sukhe ... tao majhe majhe mone hoy ekbar ekta ghai mere uthi, joler upor-ta dekhe aasi, koyekta rong chini, koyekta shabdo kane ase .. abar dube jai bhitore, goponiyo kathar maton ...

Sondhe name eksomoy, ei khupri basement-er ghorer bhetore haway urte thake koyekta chehara-heen kotha, ar rattir-ta jhup kore neme jaay - aami aalo jwele diy, ar takhon opaar theke daak aase, 'aachis?' .. ar songe songe fire aase aamar boyos-sondhi - arekbar jhanp dey oi gobhir britte, bhetor theke ek a-parajito kobi tar bhanga kalam hate arekbar uthe dnaray pranpon .. 'hya, ei elam, tumi aacho Nandini?' ...

Hajar hajar shabdo khose pore kotha theke jeno, duto ki tinte ghanta mane to ek-ekta rupkotha-i ... tao sesh hay eksomoy, aamra fire jai chena kakkho-pothe, chokhe-mukhe joler jhapta dite dite mone pore jaay aamar barmoheen shoreer ar charidiker ostro-sashtro-teer-teerondaaj .. jege uthi onek ratre, baire brishtir awaj pai ar kobita-ra pash fire shoy aamar dike .. bhorer aalo lukiye-churiye dhoke amar ghore ar swapner samay sesh hay aanguler dogay ese .. aajkal ei shaharer kothao kothao khub mon-kharap kara hawa dey thik takkhuni, jano?

Tumi esob bojho, hayto ba, hayto kichui na .. hayto aami-o sob-ta bujhini ekhono, Nandini ki tahole tumi-i? hayto na .. hayto tumi Nandini-r thekeo baro, hayto ba shudhui sei lok-tar chokhe-mukhe lege thaka sesh aalotuku tumi ... je dube jacche roj, ar uthte uthte ekbar kore pranpon dekhe nicche tomake .. ar tumi .. tumi sei purono pukurer ghate snan korte korte tar sokol dubonto kobitar dike shudhu ekmutho nirbaak chhunre diccho aalgoche ..

Sunday, December 5, 2010

কৈফিয়ৎ

সত্যি বলছি, আজকাল আর ওটা হয় না, বিশ্বাস করুন... এই নিয়ে বার পাঁচেক খাতাটা খুলে বসেছি, এক লাইন করে ভুলচাল লিখেওছি ... ব্যস ... ওই অব্দিই ... মাইরি বলছি, আমি জানতাম, আমার দৌড় ঐ চাট্টি কবিতার বেশী নয়, তাও ...

এই মাসটাই না এইরকম, জানেন তো, এই ডিসেম্বরের শুরুটা ... কলকাতায় ঠিক যে সময় বরফ পড়তে শুরু করে, ঠিক সেই সময় - আমি বুঝতে পারি ও এসেছে, ওর গলা পাই, ও আমাকে ডুবিয়ে দেবে, দেবেই ...

কফি হাউসে ঢং ঢং করে নটার ঘন্টা পড়তো, আর দুটো শরীরকে চেয়ারের জিম্মায় ফেলে রেখে দু-কাপ ইনফিউশান বেরিয়ে পড়তো ভিড়ে, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে চিৎকার করে উঠতেন জন লেনন ... সেও একটা সময় ছিলো বুঝলেন, সারা রাত আমি ফুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে বীজ ছড়াতাম ও-র বুকে, আর সকালে দেখতাম কেমন সে পাপবৃক্ষের ডালে এসে শিষ দিচ্ছে একটা নতুন আনকোরা পাখি ... দেরাজ থেকে টেনে নিতাম অস্ত্র-শস্ত্র, কালি কলম আর নির্ভুল বেজে উঠতো রিংটোন... আঃ !

ঠিক এই সময়, একটা আওয়াজ , খুব জোর ... কলকাতায় কারফিউ শুরু হলো, মা বললেন, রাস্তায় নাকি খুব গন্ডগোল, দুটো বোকা লোক গুলি খেয়ে মরে গেছে আর বাবা টিভি থেকে মুখ না সরিয়ে বললেন, 'এদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া উচিৎ' ... আমি চুপিচুপি ফিরে গেলাম কোণের ঘরে, আমার চৌকিতে ... আর ভোররাতের স্বপ্নটা খুব দ্রুত বিস্বাদ হতে হতে দেখলাম সেই পুকুরপাড়টায় আমি আর ছোটকা বসে আছি, ছোটকা একটা নিভে যাওয়া বিড়িতে ফুঁ দিয়েই চলেছে আর আমার হাতে কে যেন ধরিয়ে দিয়ে গেছে ওর একটা চিঠি ... এমন সময় বাঙ্গালপাড়ার দিক থেকে হু-হু করে হাওয়া দিতে শুরু করলো, ডিসেম্বরের হাওয়া ... আমি ছুটতে শুরু করলাম ... নিতাইদার ফ্যাক্টরি থেকে বাচ্চা আমার নাম ধরে ডাকছে পিছন থেকে, সারাদিন জানলায় বসে থাকা মিত্তির বাড়ির বৌটাও কেমন তাকিয়ে দেখছে আমায় ... আর আমি বুঝতে পারছি আলো নয় ... 'অন্ধকার ক্রমে আসিতেছে'...

তারপর থেকেই আর ওটা হয় না, জানেন ... এই ডিসেম্বর মাসটাই ...আমি জানি ও রোজ আসে ... আর বিকেলের দিকটায় খুব হাওয়া দেয় পুকুরপাড়ে গেলে... আর কিচ্ছু জানিনা ...