Sunday, November 20, 2016

তেজেনবাবুর গল্প


                                                                    <১>


তেজেনবাবুর মনমেজাজটা একদম-ই ভালো নেই আজ, এই শীতের সকালে গিন্নির তাড়া খেয়ে যাও বা বাজারে গেলেন, দু-একপিস রোগা ফুলকপির বাচ্চা আর জলডোবা পটল ছাড়া কিছুই পেলেন না, মাছের বাজারে ঢুকে মনে হলো সেদিন বেশী দূরে নেই যে মানুষ ব্যাগভর্তি পয়সা নিয়ে বেরুবে আর পকেটে ভরে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরবে, সামনের মাসে আবার বাবার বাৎসরিক, ভেবেই পেটটা একটু বকমবকম করে উঠলো যেন ! পৌনে একঘন্টা অকারণ দর-দাম করে একজোড়া বিষণ্ণ মাগুরমাছ আর পেয়াঁজকলি নিয়ে বাড়ির চৌকাঠ ডিঙ্গোতেই টের পেলেন টুবাই-টিকলু আবার পড়াশোনা থামিয়ে টিভিটা চালিয়েছে, আর পাশের বাড়ির অবিনাশবাবুও এই সক্কালবেলাই দাঁত মেজে দাদু-গেঞ্জি পরে চলে এসেছেন - চা খেয়ে, টেলিগ্রাফ পড়ে তারপর কালকের ম্যাচ আর কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার বেত্তান্ত নিয়ে ঝাড়া একটি ঘন্টা এখন বরবাদ ... নাঃ, সকালগুলো বড্ড বিরক্তিকর লাগে আজকাল ...

গতকাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা একটা করে ঝুলপি থেকে পাকা চুল কুচকুচ করে কাটছিলেন তেজেনবাবু, হঠাৎ খেয়াল করলেন আয়নার লোকটার দিকে - মনে হলো যেন ভুরু কুঁচকে থাকতে থাকতে কপালের মাঝখানটায় অল্প ভাঁজ-ই পড়ে গেছে, আর যাওয়ার নয় ... আয়না দিয়ে বসার ঘরের দেওয়ালে ঝোলা বাবার সেপিয়া-কালারের ছবিটাও ভালো করে ঠাহর করে দেখে নিলেন একবার। হ্যাঁ, সেই অব্যর্থ কূঞ্চন, কপালের মাঝখান বরাবর যেনো ইন্ডিয়ানা আর গন্ডোয়ানাল্যান্ডের ঠোকাঠুকি লেগে একটা আস্ত হিমালয় উঠছে, ঠিক তলায় এক জোড়া চোখ, ভিসুভিয়াসের থেকেও ভয়ঙ্কর... চোখগুলোর দিকে চেয়ে এই এগারো মাস পরেও বুকটা অল্প কেঁপে গেলো তেজেন্দ্রনারায়ণ বাবুর ... আবার কাঁচি-ঝুলপি তে মন দিলেন আবার।


টুবাইটা ঘর থেকে উঁকি মারলো একবার, খবরের কাগজটা নেওয়ার লোভে, আজকেই সিনেমার পাতাটা দেয় - বাবার থমথমে মুখ দেখেই আবার সুড়সুড় করে লেজ গুটিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো। মাঝে মাঝে নিজের ছেলেদের দেখলে নিজের-ই অল্প আফশোস হয় আজকাল, চেয়েছিলেন কড়া ডিসিপ্লিনে ছেলেদুটো মানুষের মত মানুষ হবে, অঙ্ক করবে তো রামানুজন, ব্যাট হাতে মাঠে নামবে তো সেওয়াগ ... হলো তো ঘোড়ার ডিম, এ দুটোয় অঙ্ক করে সেওয়াগ আর ব্যাট করে যেন চোখ বুজে ত্রৈরাশিক কষছে। মাঝখান থেকে বাবার সাথে বন্ধুত্বটা হলো না কোনোদিন-ই ... এক-একদিন অফিস থেকে বেরুতে বেরুতে মনে হয় যাই বাড়ি ফিরে গল্প-গাছা করি, তারপর সেই সার্কুলার রেলের ভিড় আর মেট্রোর সামনে হনুমানের ল্যাজের মতো লম্বা লাইন পেরোতে পেরোতে কোথায় যে ইচ্ছেটা উবে যায় ...

অফিসের নেতাইবাবু রোজ-ই আসেন টিফিন-টাইমে, রেলে কাজ করেও ভদ্রলোক সাইড বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছেন এই বয়সেও। সেই অ্যামওয়ের পিরামিড স্কিম, কে যে কার মাথায় ইঁট চাপাচ্ছে কেউ জানে না  - কেউ ডাকেও না তাকে, তাও এসে এই চেয়ার, ওই চেয়ার ঘুরে নিজেই খানিক বকবক করে যান রোজ ... আজও তেজেনবাবু চেয়ারটায় দোল খেতে খেতে ঝুলপিটায় হাত বোলাচ্ছিলেন লাঞ্চের পর, হঠাৎ দিগন্তে বত্রিশ পাটি ঝকঝক করে উঠলো দেখে বুঝলেন নেতাইবাবু ... ধপ করে চেয়ারটার নিজেকে ফেলে দিয়ে নেতাই বললেন,

" বুইলেন না মহায়, আপনার নামটাই কালপ্রিট ! তেজেন্দ্রনারায়ণ ! শুনলেই কেমন একটা ইয়ে হয় না?"
"আপনার তো কিছুই হয় বলে বোধ হচ্ছে না"
"আহা, আমি তো সাতঘাটের জল খাওয়া মানুষ, কিন্তু এই যে ডেঁপো বাচ্চারা, সারাক্ষণ তাস পিটছে, একবার আপনি করিডরটায় হেঁটে দেখুন গে, ওমনি আড্ডা থামিয়ে টকাটক এক্সেল খুলে বসবে"
"ভয় পায়, পেতেই পারে"
"ভয় না ভায়া, টেরর টেরর, লিফটে ওঠা-নামার সময় কাউকে দেখেছো কোনোদিন? দ্যাখোনি! তুমি ভায়া লিফটের দিকে হেঁটে গেলে আনকোরা জুনিয়র-রাও সাততলা সিঁড়ি বেয়ে নামে, জানো?"
"ধুর! যত্তসব ... ওরা চেনেই না আমাকে"
"সে আর চিনতে কি লাগে, তুমিই ভেবে বলো দিকি যার নাম তেজেন্দ্রনারায়ণ - সে লোকটা কোনোদিন তুড়ি মেরে শিস দিয়ে গান গেয়ে উঠবে, বা খুব আড্ডা মারবে রকে বসে?"

তেজেনবাবুর মনটা বড়োই খারাপ হয়ে গেলো - সবাই ভয় পায়, সব্বাই? কয়লাঘাটের রেলের অফিসের পাশেই মিলেনিয়াম পার্ক, জানলা দিয়ে অনেকক্ষণ সেইদিকেই তাকিয়ে থাকলেন - বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েরা স্কুল কেটে হাত ধরে ঘরে বেড়াচ্ছে, কি মজা ওদের ! তেজেন-ও কি ওইরকম-ই ছিলেন এককালে?

ছোটো ছেলে তিনি, চার ভাইবোনের মধ্যে - মা একটু বেশীই স্নেহ করতেন, আর বাবা পুষিয়ে দিতেন পিঠে কঞ্চির বাড়ি মেরে ... আর ভাইবোনগুলো বেশ প্রতিভাবান - বড়-দা ডাক্তার, মেজ-দাও দারুণ অঙ্ক কষতেন, এখন বাইরে, আর বড়দি-ও সেকালের ডাবল এম-এ, চাট্টিখানি কথা নয়, একটা নাকি ক্যাসেটও ছিলো, তিনি যদিও পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন বাবার-ও আগেই - বাবা বলতেন "মেন্ডেলিয়ান জেনেটিকস, পেডিগ্রি, পেডিগ্রি, সবটাই পেডিগ্রি" ... তিনি ছিলেনও এক মহাপুরুষ - ছেলেবেলায় ফুটবল খেলেছেন তো এক্কেবারে ফার্স্ট ডিভিশান, পাহাড় চড়েছেন তো বেস ক্যাম্প, আবার নাকি নিজের লেখা বই-ও ছিলো একটা ... ছেলে হিসেবে তেজেন এক্কেবারেই ডাহা ফেল! গোদের ওপর বিষফোঁড়া - বাৎসরিকে বাবার উপর দুচার লাইন বলার জোয়াল-টাও তার কাঁধে ফেলে বড়দা গেছেন, মেজদার কাছে বেড়াতে ...

তেজেন-এর সত্যি বলতে পড়াশুনোয় একটুও মন ছিল না। দুপুরে সবাই ঘুমোলেই পকেটে গামছা নিয়ে পাশের পুকুর, বা কোনোদিন বাবার লুঙ্গি চুরি করে জামরুল গাছের ডগায় ... প্রেমে পড়ার পরে একটা ডায়রিতে কয়েক লাইন চেষ্টা করেছিলো সে, ভালো কিছু নামেনি, বাপের বাজখাঁই গলার আওয়াজে বোধহয় কাব্যলক্ষ্মী তাদের পাড়া দিয়ে যাননি খুব বেশীদিন ... তবে ফেল-ও সে করেনি কোনোদিন, সকাল নটার বনগাঁ লোকালে যেমন প্রত্যেক স্টেশানেই ঝুলতে ঝুলতেও ঠিক আরেকটা লোক উঠেই যায়, তেজেনও তেমনি বেতের বাড়ি খেতে খেতেই বছর বছর ডিঙিয়ে যেতো ক্লাসের গন্ডি ...

ট্যালেন্ট অবিশ্যি তার-ও একটা ছিলো বটে, সেটা হচ্ছে অনর্গল ঢপ মারা - কাজে এবং অকাজে। পরীক্ষায় পঁচিশ পেলে বাড়ি এসে বলতো হায়েস্ট উঠেছে সাতাশ, ছাতা হারিয়ে গেলে সটান বলে দিতো চোখের সামনে চুরি হয়ে গেলো ধরতে পারলাম না  ... এমনকি পাড়ার বুড়িপিসি যেই জিগ্যেস করতেন, 'তেজেন, মুদির দোকান চললি?' ... তেজেন না ভেবেই বেমালুম বলে দিতো, 'না পিসি, রেশনে লাইন দিতে' ...

যেখানে বাপের ভয়, সেখানে সন্দ হয় ... বাবাও ছিলেন একেবারে সত্যবাদী চরকা, থেকে থেকেই ধরা পড়ে যেতো মিথ্যে আর কপালে জুটতো বেধড়ক পিটুনি ... ভেবেই এই শীতের দুপুরে এসি ঘরে বসেও গেঞ্জির ভেতর হালকা ঘেমে উঠলেন তিনি, ফাইলটা বন্ধ করে বার দুয়েক পায়চারি করলেন গোটা অফিসটা - তারপর চারটে বাজতেই ফোন করলেন স্কুলের বন্ধু খ্যাঁদা-কে ! আজকে আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হলো না ছ'টার ভিড়ে মারামারি করে, একটু গল্পগাছা করে-ই ফিরবেন আজকে ...
                                            
                                                                    <২>

"কনস্টিপেশান, বুঝলি, কন্সটিপেশান", সিগারেট টাকে টোকা মেরে গঙ্গার হাওয়ার উড়িয়ে দিয়ে বললো খ্যাঁদা !
"রাক্ষসদেরও হয়? জানতাম না"
"না না, আমার না - এমনি বাঙালী জাতির ... ওই কনস্টিপেশানে ভুগেই গেলো, এই তুই যেমন"
"বাজে বকিস না তো... আমার আজ --"
"আঃ শোন না, এটা মেন্টাল ... এই যে তোর ভেতর যে আরেকটা তেজেন, তারও ইচ্ছে করে, বাইরে বেরুই, একটু আড়মোড়া ভেঙ্গে সন্ধ্যের হাওয়া খেয়ে বাড়ি ফিরি? তাকে যে গত চল্লিশটা বছর আটকেই রাখলি খাঁচায়, কিছু লাভ হলো? ... ভেবে দ্যাখ একবার !"

                                                                      <৩>

ফিরতে ফিরতে ন-টাই বেজে গেলো তেজেন্দ্রনারায়ণের । কয়েক-কাপ চা সিগারেট পেয়ে মনটা আজকে বেশ ফুরফুরা শরীফ বোধ হচ্ছে । গিন্নির নাক পুরো ব্লাডহাউন্ড, ঢুকতেই  হাত থেকে টিফিন বাক্স নিতে নিতে বললেন,
"এই যে বললে ছেড়ে দিয়েছো?"
"আর বলো না, লালগোলা লোকাল তো, কোনটা প্যাসেঞ্জার - কোনটা ভেন্ডার বোঝা যায় না, পাশের একটা দিলখুস-ওয়ালা যাচ্ছিলো, গোটা রাস্তাটা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে গেলো"

গিন্নিও জেরা থামিয়ে টুবাই-টিকলুকে পড়া ধরতে চলে গেলেন। তেজেন-বাবুর মনে হলো শোয়েব আখতারের বলে আলতো খোঁচা দিয়ে উইকেট-কিপার, স্লিপ গলে যেন একটা বাউন্ডারি মারলেন তিনি ... বসার ঘরে ঢুকেই দেখলেন আবার অবিনাশবাবু, সকালের পড়া কাগজটাই পড়ছেন আরেক রাউন্ড চা ধ্বংস করতে করতে,

"হেঁ হেঁ, খুব লেট যে আজকে, খুব খাটাচ্ছে না রেল কোম্পানি? তা আর নতুন লাইন তো আর পাতছে না বাবা, খাটায় কেনো কে জানে? ... আচ্ছা আমার ওই রিজার্ভেশানটা? পারলেন নাকি একটা ম্যানেজ করতে ... দাদা- বৌদিকে কিন্তু কথা দিয়েছি"
"নাঃ মশাই, টিকিটটা এবার হলো না আর বুঝলেন? আসল খবর তো আর পড়েন না, এদিকে আন্দামানে ভল্ক্যানো-টা জেগে উঠেছে আর পুরীর সমুদ্রে নাকি হাঙর বেরিয়েছে ! তা-ই এবার পুজোয় ঝেঁটিয়ে সব বাঙালী ডাল-লেক ... এতো আগে থেকে কেটে ফেলেছে যে এবার বাথরুমে আপার-বার্থ -লোয়ার বার্থ লাগাতে হবে, আপনি বরং মুকুটমণিপুরটা ট্রাই করে ফেলুন "

অবিনাশবাবুর চুপসে যাওয়া মুখটাকে দেখতে দেখতে এবার সত্যি তেজেনবাবুর মনে হলো একটু হাততালি দিয়ে নেচে নেবেন, যেনো স্টেপ আউট করে স্টুয়ার্ট ব্রডকে ছয় মারলেন গাঙ্গুলী ... অনেকদিন পরে একটা হিন্দি গানের লাইন-ও মাথায় কোন কুঠরি থেকে বেরিয়ে পড়লো, তেজেনবাবু ঠিক করলেন, নাঃ টুবাই-টিকলুকে আজকে আর অ্য্যালজেব্রা না করিয়ে গল্পই শোনাবেন বরং ... বাৎসরিকের স্পিচটারও আইডিয়া আসছে মাথায় !

                                                                           <৪>

"থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ ... অবিনাশবাবু এবারে একটু বসুন, এই টুবাই দেখতো কলিংবেল বাজালো কে? টিকলু মা-কে দেখো তো কি লাগবে? ...

আপনারা যে এতোসবের মধ্যেও এসেছেন ... কি বলবো, খুব-ই একটা আনন্দের ব্যাপার, বাবা বেঁচে থাকলে ... অবশ্য তিনি থাকলে কি আর বাৎসরিক করতাম ... যাই হোক, বাবাকে যাঁরা চেনেন অনেকদিন - তাঁরা তো সব-ই জানেন, তা-ও দু-চারটে কথা বলবো আজকে...

আমার বাবা, রাজেন্দ্রনারায়ণ, সারা জীবন ইস্কুলে পড়িয়েছেন, কিন্তু শুধুই মাস্টার ভাবলে ভুল হবে! আমার বাবা ছিলেন একাধারে অনেক, তিনি ছিলেন ফুটবলার, পর্বতারোহী, আবার রীতিমতো প্রকাশিত হওয়া লেখক-ও ...এক-ই অঙ্গে এতো রূপ যাকে বলে !

যখন ফুটবল খেলতে নেমেছেন, ভারতবর্ষ তখনও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, বাবা বললেন, নেটিভ রেফারী না দিলে টিম মাঠেই নামবে না - তার সাহস ছিলো, ইংরেজ শাসক মেনে নিলো, আবার যখন পাহাড়ে চড়েছেন, মাইনাস টেন-এ পাহাড় চড়ে পৌঁছেছেন অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পে - সেখানে কত দেশের লোকের সাথে আলাপ ছিলো, পেন ফ্রেন্ড ছিলেন অনেক ফরেনারের ... সেসব চিঠি আছে এই বাড়ির-ই কোথাও !
ফিরে এসে বই-ও লিখেছেন চাকরি করতে করতে, কিন্তু লজ্জার কথা, সে বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি ... জন্মের আগেই লাস্ট কপিটাও হারিয়ে গেছে কোথায় কেউ জানেনা ...

আমি সে তুলনায় নিতান্তই সাদামাটা ছাপোষা একজন কেরানী, কোনো দাগ-ই কাটতে পারিনি ... কিন্তু আশা রাখি বাবা, তার কাজের দৌলতে আপনাদের মনে চিরজাগরূক থাকুন"


                                                                       <৫>

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি-ই হলো একটু তেজেনবাবুর, বড্ড ধকল এক-একটা ফাংশান ! উঠে দেখলেন সকাল দশটা দশ, গিন্নি টুবাই-টিকলুকে নিয়ে কোচিং ক্লাসে চলে গেছেন - সত্যি বাচ্চাগুলোর রোববার বলেও কিছু নেই ! কিচেনে একটা উলটে রাখা প্লেট, চ্যাঙ্গারিতে জিলিপি রাখা, আর কাগজের ঠোঙ্গায় কচুরি ... এখনও একটু গরম আছে। প্লেটটা নিজে দিকে টানতেই দেখলেন, তলায় একটা ভাঁজ করা কাগজ - ফুলস্ক্যাপ পায়োনীয়ার খাতা, ধারটা একটু এবড়ো-খেবড়ো  হয়ে গেছে টেনে ছিঁড়তে গিয়ে ...

বাবা, 

গতকাল তুমি ক্লান্ত ছিলে, মা-ও... তাই চিঠিটা আজকে দিচ্ছি, নিশ্চয়ই কোচিং থেকে ফেরার আগে তোমার পড়া হয়ে যাবে, তা-ই এসেই বকুনি বা মার খাবো এটা জেনেই আজকে আর মন বসবে না পড়ায় ... 

দাদুভাইয়ের হাত কাঁপতো খুব জানো তো? তাই দুপুরে বাড়ি থাকলেই আমাদের ডেকে ডিক্টেশান দিতেন, ডায়রি লেখার জন্য, এক ঘন্টা টানা লিখে দিলে দশ দশটা টাকা! বলতেন আত্মজীবনী লিখছেন, তাই বানান-গ্রামার যেন একটুও ভুল না হয় ... তা-ও একটা দুটো হয়েই যেতো, কি করবো !

ডায়রিটা এখন সবসময় আমাদের স্কুল ব্যাগেই ঘোরে, আমরা টিফিন টাইমে আর ছুটির পরে ছোটবাড়ির ঠাকুরদালানে বসে পড়ি মাঝেমাঝেই, যেদিন খুব মনে পড়ে ... এখন প্রায় সবকটা পাতাই মুখস্ত হয়ে গেছে ... তাই তোমাকে না দেখেই বলতে পারি কবে কি হয়েছিলো !

ছোটোবেলায় খুব হাঁপানির টান ছিলো দাদুভাইয়ের, তাই টানা খেলতে পারতেন না ... তবে পায়ে নাকি দারুণ কাটাতে পারতো এদিক ওদিক, তাই রিজার্ভ বেঞ্চে বসতে হতো সব ম্যাচেই ... একটা বড় ম্যাচের ফাইনালে ডাক পেয়েছিলো, তবে খেলতে নয়, রেফারি আসেনি বলে দাদুভাই বাঁশি নিয়ে নেমে পড়েছিলো মাঠে, ভাবতে পারো? 

টিক্লুরও হাঁপানির টান, ওর-ও বেশী হাইটে যাওয়া কষ্ট, তবে ওর-ও খুব ইচ্ছে একদিন যাবে । দাদুভাইয়ের সকালের সেই গানটা আছে না, "পঙ্কে বদ্ধ করো করী, পঙ্গুরে লঙ্ঘাও গিরি"। আমাদের বলতেন পাহাড়ের মাথায় আজকাল নাকি সোজা হেলিকপ্টারেই যাওয়া যায়, একদিন নিশ্চয়ই সবাই মিলে গিয়ে দেখবো , তাই না বলো?

বইটা সত্যি ছিলো কিনা সেটা কিন্তু আমরা জানিনা, হয়তো ছিলো, সে গল্পটা আর ডিক্টেশানের সময় পাইনি... তবে ডায়রিটা র ভেতরে লেখা তোমাকে উৎসর্গ করে গেছে দাদু, আর মলাটের উপর নামটা কাঁপা কাঁপা হাতে লিখে গেছে নিজেই । 
আগে পড়তে পারিনি, কাল সন্ধ্যেয় গানটা শুনে চিনতে পারলামঃ 
"আমার শেষ পারানির কড়ি কন্ঠে নিলেম " ... 


ইতি,
টুবাই ও টিকলু 



Sunday, November 13, 2016

নানা রঙের দিনগুলি


শীতকালের ভোরবেলা, ধরুন সাড়ে চারটে কি বড়ো জোর পাঁচটা, আকাশে অন্ধকার একটু একটু করে ফিকে হয়ে আসছে, দু চারটে বাড়িতে আস্তে আস্তে একটা করে আলো যেন জ্বলে উঠেই আবার নিভে গেলো, ছেঁড়া স্বপ্নগুলো জানলা দিয়ে আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে কলের শব্দ আর বাসনের আওয়াজের সাথে, এমনি সময় ঠাহর করলে দেখবেন, বনহুগলীর ঝিলের পাশে একটা গুমটি ঘরে আলো জ্বলে উঠলো, তাপসদা জল চাপালেন একটা স্টোভে, আর একটায় সসপ্যানে তেলের ছ্যাঁকছোঁক আওয়াজ ...

এতো সকালে যখন উঠেই পড়েছিস, ভিতরে চলে আয় ... একটা ফাঁকা জায়গা দেখে এইবেলা বসে পড়, আরেক রাউন্ড স্পেশাল চা এসেই যাবে এক্ষুনি, কোনটা যে কার কেউ জানে না, আর নেভি কাটের প্যাকেট তো অক্ষয় তূণ - খুঁজলে একটা আধটা সিগারেট ঠিক-ই পেয়ে যাবি (ছেড়ে দিয়েছিস? কদিন? নাকি ঘন্টা?) ... চল তোকে নতুন একটা স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাই ! স্পটলাইট তো কবেই নিভে গেছে, এইবেলা স্টেজে উঠলেই বা দোষ কি?

 আমাদের বাড়ির ঠিক পিছনেই এক-কালে দু-দুটো বিশাল পানাপুকুর ছিলো, তাদের একটার পাশে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট জমি - আইনি মারপ্যাঁচে ফেঁসে গিয়ে যে দেশলাই বাক্স হতে হতে হয়ে গেলো আমাদের খেলার মাঠ, আদরের নাম "প্রবাহ" ... নামটা কে দিয়েছিলো আজ আর মনে পড়ে না, তবে তার দূরদৃষ্টি যে অসামান্য তা স্বীকার না করে উপায় নেই, Y2K ক্রমে আসতে আসতে যে কয়েকটা জিনিষ হারিয়ে যায় সবার অলক্ষ্যে, প্রবাহ তাদেরই একজন ... তো প্রবাহ যে শুধুই পুকুরে ফুটবল ফেলে আর একটা স্পেশাল বাড়ির অ্যাসবেস্টসের ছাদে ক্যাম্বিস বল তুলেই দিন কাটায় না, সেইটা প্রমাণ করার দরকার পড়লো অচিরেই - এক বিকেলে মাঠে গিয়ে দেখি ওমা উইকেটের জায়গায় মাদুর পাতা - পাশাপাশি দু-দুটো নাটকের রিহার্সাল, একটা তো সেই রবি ঠাকুরের "পেটে খেলে পিঠে সয়", আর একটায় বোধকরি একটা ভয়ের গল্প। ভয় মানে বেশ ভালো ভয় - একজন হাবাগোবা লোক মিউজিয়ামে ঢুকে হারিয়ে গেছে আর রাত্রে মূর্তিগুলো জেগে উঠে তাকে গলা-ফলা টিপে ধরে বীভৎস কান্ডকারখানা - তো আমারও প্রথম রোল ওই মোমের মূর্তি, ডায়লগ নেই, মুখেচোখে কুটিল এক্সপ্রেশানও নেই - খালি রুমাদি ইশারা করলে পা টিপে টিপে এগোও ... কিন্তু পানাপুকুরের পাশে মাঠ, মশা-রা কি আর নাইট্যশালা বোঝে? বার পাঁচেক কানমোলা খেয়ে বোধহয় নিরীহ গলায় কিঞ্চিৎ প্রতিবাদ করেছিলাম ... পরের তিন মাসে বুঝলাম, পেটে খাও বা না খাও, নাটক করলে পিঠে অনর্গল সইতেই হবে, না হলে তুমি বাদ ...

কিলে কাজ দিয়েছিলো, সেই কচি বয়সের পর বহুদিন রিহার্সাল শুনলেই চোঁচা দৌড় দিতাম যেন ব্রিগেডে টিয়ারগ্যাস পড়েছে - কিন্তু ওই ডেস্টিনি, কোথায় আর যাবে, একদিন টিফিনে স্কুলের পিছনের সেই ক্রিকেটের মাঠে ক্লাস টেনের দাদাদের কাছে একটা সুখটান দেবো বলে তীর্থের কাকের মতো বসে আছি ঝোপের ধারে, হঠাৎ শুনি কংক্রিটের পিচের উপর জলদ্গম্ভীর গলায় কে যেন চেঁচিয়ে উঠলো, "আর ভয় নাই, সুপ্ত সিংহ জেগেছে ! ভীমসা !!" ...

ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে দেখি স্টেজের উপর দুইটি বেচারা ছেলে প্রাণপণে গাঁতাচ্ছে, যেটা লম্বা সে সেজেছে প্রতাপ, আরেকটি বেশ নাদুস-নুদুস, সে শক্ত সিংহ ! তো খানিক ধরা পড়ার ভয়ে, আর বাকিটা ডি এল রয়ের ডায়লগে রক্ত গরম হয়ে, উঠেই পড়লাম স্টেজে - এদিকে বিধি কিন্তু সমানে বাম, যেন অ্য্যাডিলেডের মাঠে শচীনকে আউট করতে নেমে পড়েছেন ম্যাকগ্রা আর ড্যারিল হার্পার ... আমাকে যে রোলটা দিলো, সে একটা সভাকবি, ছেলেদের স্কুল তাই নাটকে কোনো নারী চরিত্রই নেই - অত্তগুলো ডায়লগ জলে যাবে, তাই ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো আমি - ইদিকে আবার রামকৃষ্ণর নামে স্কুল, প্রতাপের ভোকাল টনিকে সৈন্যদল উত্তেজিত হয়ে গান গাইবে, "ধাও ধাও সমরক্ষেত্রে", হঠাৎ স্বামীজি মহারাজ এসে বায়না জুড়ে বসলেন না ওইখানে "জয় রামকৃষ্ণ জয়তু' গানটা গাইতেই হবে ...

নাটক অবিশ্যি বিশাল হিট হলো, ডি এল রয়ের সেইসব জ্বালাময়ী ডায়লগ শুনে জনতা রেগে গেলেন, প্রতাপ আর শক্তের ঝগড়ায় চোখ ছলোছলো করলেন, এমনকি চেতক মারা যাওয়ার সময় যা কান্নার রোল উঠলো শুনে পেত্যয় যাবেন না যে স্টেজে ঘোড়াও ছিলো না, ঘাস-ও না ... আমি যে খুব ক্ল্যাপ পেলাম তা নয় - স্টেজের উপর সময় দু-মিনিট দুলে দুলে কি বলেছিলাম জানিনা, অটোয় করে ফেরার সময় মা বললেন, 'বাবা পরের বার আর একটু জোরে গলায় বলিস, কেমন'?

সেই যে শ্লা রোখ চেপে গেলো, গলা শুনিয়েই ছাড়বো সে আর যাওয়ার নয়, এ পাড়া, ও পাড়া, ইস্কুল-কলেজ যেখানেই দেখি ম্যারাপ বেঁধে নাটক হবো হবো ভাব, গিয়ে নাম লিখিয়ে দিই ... কিন্তু কপালের নাম গোপাল, গলা কেউ-ই শুনতে পাবে না বলে পার্মানেন্ট জায়গা স্টেজের পাশে, হাতে একতাড়া চোতা নিয়ে প্রম্পটার ... লাগুক না লাগুক, গোটা নাটক বিড়বিড় করে আউড়ে যাও - কার কবে গাঁত উল্টোবে সেই আশায় ...

উল্টালোও, তবে গাঁত নয় - শিশি ! পাড়ারই নাটক ছিলো হবে, হিরো আমাদের সমাজের উপরে ঘেন্নায় মিনিট পয়ঁতাল্লিশ চিল্লমিল্লে লাস্ট সিনে বিষ খাবে - সব ডায়লগ বলা শেষ, অডিয়েন্সে তখন রুমাল খোঁজার হিড়িক পড়েছে চাদ্দিকে - এমন সময় হিরো বুঝলো, পকেটে চোতা থাকলেও বিষের শিশিটা ফেলে এসেছে ড্রেসিং রুমে ... আবার না মরলেও চলে না, এ তো আর কোয়েন ব্রাদার্স নয়, যা হোক করে শেষ করে দিলেই হলো - হিরোর মাথায় বাল্ব জ্বলে উঠলো, গোটা একটা অডিয়েন্স হাঁ করে দেখলো প্রতিবিপ্লব কেমন নিজের গলা টিপে আঁকুপাঁকু করে নিজেই মরে গেলো ...

কলেজে এসে দেখলাম, নাটকের ছড়াছড়ি - বছরে দুটো কালচারাল ইভেন্ট, রিপলস আর স্পটলাইট ... স্পটলাইটে সব ব্যাচ-ই একটা করে নাটক নামায়, আমরাও লেগে গেলাম হইহই করে ... প্রথম বছর ঠিক হলো বিরিঞ্চিবাবা ... দিব্যি নেমেও গেলো সেটা ... আমার রোল ছিলো নিবারণদা, রুমমেট ছিলো সত্য আর বিরিঞ্চিবাবা আর তার শাগরেদ ব্যাচের দুজন বাঘা অ্যাক্টর ... রিহার্সাল চলছে, আমরা গল্প থেকে স্ক্রিনরাইটিং করছি ... এক জায়গায় আছে সত্য হাসি চাপতে মনে মনে কল্পনা করছে ট্রেনের কলিসান হয়েছে আর রক্তারক্তি কান্ড, এক সিনিয়র দাদা রিহার্সাল দেখতে এসে আইডিয়া দিলো, "এই সিনটায় সব্বাই সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়বি, যেনো হাসপাতালের বেডে শয়ে শয়ে মৃতদেহ ... আর একটা ছেলে এইসময় কালো টিশার্ট পরে ঘরের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চলে যাবে" ... আমরা তো এসব শুনে ট্যান,রুমমেটের চিরটা কাল-ই খুব সাহস, আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা কালো টিশার্ট টা কিসের প্রতীক?" সিনিয়র দাদা গম্ভীর মুখে বললেন, "মৃত্যুর কালো হাওয়া" ...

তো ফি বছর একটা করে নাটক হতো, সব-ই মজার গল্প, সেকেন্ড ইয়ারের নাটক হলো 'পানু গোয়েন্দা আর উডি অ্যাসিস্টান্ট', সেটা যে ঠিক কি ছিলো, whodunnit না ভূতের গল্প এখন আর ভালো মনে পড়ে না ... তবে রিহার্সালগুলো ছিলো দারুণ আড্ডা ! কিছু কিছু লোক হয় না, অসম্ভব এন্থু, আর ততোধিক এনার্জি, যেনো ওবেলিক্সের মতন ছোটোবেলায় রেডবুলের চৌবাচ্চায়র পড়ে গেছিলো, তাই বড় হয়ে আর কিছু লাগে না- আমাদের ব্যাচেও ছিলো ! অর্ণব বরাট ! তাঁর মহিমাকীর্ত্তন করতে গেলে বই লেখা হয়ে যায়, তাও ধরুন এই আপনি সন্ধ্যেবেলায় ক্লান্ত শরীরে ভাবছেন, আহ একটা এগরোল, অমনি দেখবেন ম্যাজিকের মতন সামনে বরাট, হাতে একটি বোর্নভিল ... আমরা নিশ্চিৎ ছিলাম তার বরাটের আসল টাইটেল ভগবান, অথবা ঈশ্বরের ন-লক্ষ কোটি নাম থাকতে পারে, কিন্তু পদবী একটাই, বরাট !

পরের বছর আরেক কাঠি সরেস, টাইম মেশিনে করে ঝিলাম নদীর পারে, সেই আলেকজান্ডার আর পুরুর সময় ... নাটকের নাম "সত্য সেলুকাস", তাঁর স্ক্রিপ্টখানা ছিলো হীরক রাজার দেশের মতন, কবিতায় ঠাসা ... আর মধ্যে মধ্যে এল্ভিস-এর গান ... সেসব বড়ো সুখের সময় !

আরেক বছর বড় হলাম যখন, দেশে তখন আগুন জ্বলছে ! নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরের ছবি দেখে শিউরে ওঠা তখন রুটিন ... কিছু একটা বলার ইচ্ছে গলা বেয়ে উঠে আসে কিন্তু বেরোতে পারছে না ... সে বছরে আমরা নাটক করলাম, নাম "ব্যাঙ্গমঙ্গল" ... সেই অ্যাবসার্ডিস্ট প্লট, রাজসভায় দুই রাজা, বুদ্ধু আর ভুতুম, তাদের বিপক্ষে এক ক্ষমতাময়ী দিদি আর তার চ্যালা বিব্রত, আর প্রোটাগনিস্ট - মার্স থেকে জমির লোভে এসে পড়া দুই অ্যালিয়েন, মঙ্গল আর পান্ডে ... এত কিছু থাকবে আর স্টার আনন্দ আসবে না, তাই হয়? ক্যারেক্টার তৈরী হলো সাংবাদিক কুমন দে ...

নাটক তখন আমাদের সবকিছু জুড়ে, কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে হাতে পেলাম অজিতেশের অনুবাদ চেকভের পাঁচটি একাঙ্ক (অতীশ দাশগুপ্ত এক্ষুণি বকে দিয়ে বলবেন, ওটা চেকভ নয়, শেকভ!) ... আর টিউশনি করতে যাওয়া এক বাড়িতে একের পর এক দারুণ নাটকের বই ... এক সন্ধ্যায় মেসের বাইরে নোটিশ পড়লো, হইহই কান্ড, রইরই ব্যাপার, আ গিয়া ড্রামা ক্লাব ...

দারুণ শুরুয়াৎ হলো, সপ্তাহে সপ্তাহে মিনি ওয়ার্কশপ গোছের রিহার্সাল, নাটক ও চলছে, কিন্তু তার ডায়লগ কেউ মুখস্ত করবে না ... পরিস্থিতি বুঝে নিজেরাই লিখে নেবে নিজেদের সংলাপ ! গল্প সমানে তৈরী হতো, রিহার্সালের ভিতরে-বাইরে - আমরাও কোনো এক কোণে বসে মুহুর্তে মুহুর্তে লিখে ফেলতাম কত গল্প, আর রাত বাড়লে অ্য্যাশট্রে তে ছাইয়ের সঙ্গে তাদের ফেলে চলে যেতাম ছাদের মালপার্টিতে ... আমার এফ এম-এ শ্রীকান্ত আর ওল্ড মঙ্ক !

বীজ থেকে গাছ হতে লাগলো পাক্কা একটা গোটা বছর ! কলেজের জিওলজি অডিটোরিয়ামে একসাথে দু-দুটো নাটক নামলো সেবার, একটার নাম 'চেক-মেট' আরেকটা 'প্রস্তাব' ...

চেক-মেট আসলে ঠিক নাটক নয়, একটা পালানোর গল্প - হঠাৎ করে অনেকদিন আগে ফেলে, মাড়িয়ে আসে অতীত যদি সামনে এসে বলে 'বাবু দুটো পয়সা দে' ... কি করবেন সেই কলেজের অধ্যাপক? একটা ঠান্ডা নল, একটা দুর্বল মুহুর্ত  - আর এস্কেপ? নাহ, হাসালেন ...

উল্টোদিকে প্রস্তাব ছিলো দারুণ মজার, ওই অজিতেশের বই থেকেই ... মাত্র তিনজনের কাস্ট, প্রাণগোপাল, রমা, আর রমার বাবা - দুই জুনিয়র দুটো মেন রোল, আর রমার বাবা - আমার ক্লাসমেট এবং গ্লাসমেট... সিনে সিনে অডিটোরিয়াম ফেটে পড়ছে হাত্তালিতে ... কোনো বন্ধুর মুখ হয়তো একটু গোমড়া, অনস্ক্রিন আর অফস্ক্রিন ঘেঁটে যাচ্ছে থেকে থেকে, তবু বুকে পাথর রেখে সেও হাততালি দিয়ে যাচ্ছে সমানে ... সেই বছরেই শ্রুতিনাটক কম্পিটিশানে, দুই বন্ধু করে ফেললো অজিতেশের দু-দুটো একাঙ্ক, 'তামাকু সেবনের অপকারিতা' আর 'নানা রঙের দিনগুলি' ...

নাটক সিরিয়াস হোক বা মজার, রিহার্সালগুলো ছিলো খিল্লিবাজির ঠেক ... স্টেজেও কি কম হতো? চেকমেট হওয়ার সময়, উইংসের উপর থেকে আলো কন্ট্রোল করার কথা দুই বন্ধুর ... এদিকে এক সিনে ছিলো পাড়ার গুন্ডারা মূল চরিত্রকে মারধর করছে খুব, হঠাৎ দেখি উইংস ফেলে সব্বাই গিয়ে প্রোটাগনিস্টের প্রতিবাদী পাছায় দমাদ্দম লাথি ! পুষে রাখা রাগ, আর কি !

আই-এস-আইও এদিকে শেষ হয়ে আসছে, এই সময় একদিন বাবুদার দোকানে চা খেতে গিয়ে রাস্তায় দেখি একটা পুঁচকে বেড়াল, বেচারা-কে কাকে ঠোকরাচ্ছে খুব ... একটা পেপ্সির ক্রেটে তাকে ভরে নিয়েই চলে এলাম হোস্টেলে, নাম রাখা হলো ঘঞ্চু, ভালো নাম তেজেন্দ্রনারায়ণ বসু (কেন বসু তা বলতে গেলে ঝুলি থেকে যে আরও কটা বেড়াল বেরোবে কেউ জানেনা, তাই চেপে গেলাম) ...

ঘঞ্চু বলাই বাহুল্য একা এলো না, এলো অনেককে নিয়ে, যাঁরা বেড়াল ভালোবাসেন, যাঁরা বেড়ালকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের বড়োই ভালোবাসেন (অর্থাৎ সেকেন্ড অর্ডার পশুপ্রেমী) , যাঁদের বেড়াল দেখলে তিড়িতঙ্ক হয় কিন্তু তা-ও হৃদয় অবাধ্য ম্যাও ... অচিরেই দেখা গেলো সন্ধ্যে নামলেই আমার রুমে প্রচুর লোকের কিলবিল, আর আমরা সেই তাপসদার চায়ের আড্ডায় ! এই "আচ্ছে দিন"-এর জোয়ারেই হয়তো হবে বা, ড্রামা ক্লাব-ও হঠাৎ সুদিন ফিরে পেলো ... বিমলদা বললেন, টাকা নিয়ে ভাবিস না, একটা ড্রামা ফেস্ট শুরু করে ফ্যাল ! ব্যাস ! শুরু হয়ে গেলো প্রতিচ্ছবি ২০০৮ !

প্রতিচ্ছবির পোস্টার ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন? সেই ছোট্টবেলায় সরস্বতী পুজোর নেমন্তন্ন নিয়ে রাজকুমারী যেতাম, সেই আর এই ... একদিন যাদবপুর, তো একদিন জেভিয়ার্স ... সকালে কৌশিক সেনের গ্রীন্রুম তো বিকেলে নান্দীকারের অফিসে স্বয়ং রুদ্রপ্রসাদ । একদিন আমি আর এক বন্ধু চলে গেলাম শান্তিনিকেতন, দারুণ একজন লোকের সাথে আলাপ হলো, তারক সেনগুপ্ত - বললেন সঙ্গীত ভবন তোতাকাহিনী নিয়ে আসবে । জেভিয়ার্সের দল এলো, যাদবপুরের-ও । প্রত্যেক রাত্রে তখন আম্রপালী-তে রিহার্সাল, সেই আম্রপালী - উৎপল দত্ত যেখানে মন্ত্রমুগ্ধ করে গেছেন দর্শকদের আমি জন্মানোরও আগে । ঝিঁঝিঁ ডাকা রাত্তির, স্টেজের উপর বলে-কয়ে একটামাত্র লাইট, আর শেষ না-হওয়া মঞ্চে আমরা কজন ...

শান্তিনিকেতন-এর দল যেদিন পৌঁছবে, তার আগের দিন তারকদা এসে দেখে গেলেন সব - আমরাও রেডি, চুয়ান্ন জন কলাকুশলী, তাঁদের রাখা হবে আইসেক-এর গেস্ট হাউসে, সব মেস-এ নোটিশ পৌছেঁ গেছে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করার । আসার দিন সক্কালবেলা বাস যখন স্টেশন থেকে ফিরলো, দেখি সেই চুয়ান্ন জনের মধ্যে পঞ্চাশজন-ই শান্তিনিকেতনের ছাত্রী ...

সেদিন ক্যাম্পাসে যা হুড়োহুড়ি তেমন বুঝি বয়েজ হোস্টেলের ছাদে বোম ফাটলেও হতো না । সকালে হয়তো ভজমুরারীবাবু প্যান্টে শার্ট গুঁজে ক্যাম্পাস যাচ্ছিলেন হেলেদুলে, হঠাৎ একদঙ্গল মেয়ে দেখে ব্যাগ কাঁধেই মেসে গিয়ে তিনবাটি সম্বর খেয়ে, চারবার বোতলে জল ভরে ফেললেন । যে ছেলেটি জিন্দেগিতে ক্লাস ডুব মারেনি নোট না পাওয়ার ভয়ে, সে-ও দেখি কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত ও যারপরনাই বলিপ্রদত্ত হয়ে ঘুরতে লাগলো সাউথ উইং-এর করিডরে ...

সেবার যে নাটক করেছিলাম, তার কথা আজ বরং থাক (সব কথা কি খুলে বলতে পারবো কোনোদিন?) শুধু এইটুকু বলা যায় সে নাটকের নাম ছিলো "সব চরিত্র কাল্পনিক নয়" (এবং না টুকি নি, আমাদের নাটক ঋতুপর্ণ বাবুর ছবির আগেই বেরিয়েছিলো) । আর নাটকের লাস্ট সিনে যে শিখাটা নিভে গিয়েও নিভলো না, সেটা আর যাই হোক, কাল্পনিক নয় । নাটক হিট করেছিলো জানেন? তবে অডিয়েন্স ডাহা ফেল ...

সেই যে সেদিন স্টেজ থেকে নামলাম, জানতাম না সেটাই শেষ স্পটলাইটের আলো । তারকদা নাটকের পরে যখন এসে বললেন, নাটক তো দারুণ হলো বাবা - কিন্তু এ তো শুধুই হতাশা, শুধুই অন্ধকার - এর থেকে উত্তরণ কোথায়? বলেছিলাম, সেও একদিন হবে তারকদা, আরো বড়ো হই !

তারপর ? তারপর যা হয়, তা-ই ... বড়ো হলাম, বুড়ো হলাম, কোথায় সেসব রিহার্সালের দিন, কোথায় সেই সব কুশীলব, যে যার পার্ট বুঝে নিয়ে, লাইন মুখস্ত করছে নিজের নিজের ঘরে বসে । স্পটলাইট নিভে যায় এইভাবেই, আমাদের অজান্তে । এক একদিন এখনো ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসি ভোর চারটে, সাড়ে চারটেয় - বাথরুমের আলোটা হঠাৎ জ্বলে উঠলে মনে হয় যেনো উইংসের ধারে ভুল করে একটা দেড় হাজারের হ্যাজাক লাগিয়ে গেছে বাপ্পাদা । আবার সেই পুরোনো ভয়টা ফিরে আসে - নেক্সট উইকে স্টেজ রিহার্সাল আর এখনো একটা গোটা সিন লেখা বাকি ! এক একদিন বাড়ি ফেরার রাস্তায় ক্লান্ত পা টললে নিজেই নিজেকে বলে উঠি, "প্রে ডু নট মক মি, আই অ্যাম আ ফুলিশ, ফন্ড ওল্ড ম্যান" !

তাও সেই ভোরবেলায় জানলার কাঁচে কুয়াশার মতন লেগে থাকে দু-একটা ছেঁড়া স্বপ্ন ! সেই স্বপ্নের মধ্যে আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই আম্রপালীর মাঠটায় । দেখি খুব ভিড় হয়েছে, লোক দাঁড়িয়ে গেছে গেট পেরিয়ে ... স্টেজে সেই লাস্ট সিনটা হচ্ছে আর দেশলাইটা জ্বলেও জ্বলছে না । উইংসের ধারে কয়েকজন পায়চারি করছে কপালে ভাঁজ ফেলে, হাতের সিগারেট টা টানতে ভুলেই যাচ্ছে টেনশনে ...

আর একটু দূরে ভিড়ের মধ্যে আমি, মনে মনে ভেবে ফেলছি আরেকটা নাটকের প্লট ... এবার আর কলেজ ক্যাম্পাস না, একধাক্কায় গিরীশ মঞ্চ, পরেরবার অ্যাকাডেমি, বিশ্বাস কর !

Saturday, November 5, 2016

কলকাতা - ১০৩ !


এই হাল্কা হাল্কা শীতকালের সকালে যদি মর্নিং ওয়াক করতে করতে চলে যান জামরুলতলায় আমাদের সেই ছোট্টো ভাড়াবাড়িটায়, একদম কোনের ঘরটায় দেওয়ালে দেখতে পাবেন, অল্প-অল্প খসতে থাকা পলেস্তারার পাশ থেকে, শাহরুখ খান আর মধুবালার থেকে নিরাপদ দূরত্বে একটা ঢাউস বাঁধানো ছবি - আস্তে আস্তে ড্যাম্প ধরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন, ছবিটা মাটি থেকে দেখলে মাথামুন্ডু কিস্যু বোঝা যায় না, একটা ছাদে ইউনিফর্ম পরা গুচ্ছের লোকজন, লিট্যার‍্যালি-ই যাকে বলে 'দেড়শো খোকার কান্ড'। অত্যুৎসাহী দর্শকদের জন্য তলায় একটা লিস্টও দেওয়া, 'যে যেখানে দাঁড়িয়ে'। সেইটা না দেখলে বোঝা মুশকিল যে যাঁরা গাঁটের পয়সা খরচা করে এই বিশাল জিনিষটা টাঙ্গিয়ে রেখেছেন, তাঁদের পোলাপান-ও ওই ভিড়ের-ই অংশ ... কোথাও একটা পিছনের দিকে লুকিয়ে আছে, চট করে ধরা মুশকিল ...

সত্যি বলতে নরেন্দ্রপুর নিয়ে আমার দশা ওই ছবিটার মতন-ই, ঝাপসা, অন্ধকার, আস্তে আস্তে নামগুলো মুছে যাচ্ছে। তাও, হঠাৎ একটা রোববারের বিকেলে পুরোনো ছবি থেকে ধুলো ঝাড়তে কার না ভালো লাগে বলুন?

আজকের এই লেখাটা অনেকটা সঞ্জয় মঞ্জরেকারের কমেন্টারির মতন, ধরুন শচীন একটা দারুণ ইনিংস খেলে যখন আউট হয়ে গেলো আর অকর্মার ঢেঁকি বাকি তিনটে উইকেট মিলে সামান্য সতেরোটা রান-ও তুলতে পারলো না, অমনি ম্যাচের পরে স্যুট-টাই পরে এসে মঞ্জরেকার বলে বসলেন, 'আরেকটু চালিয়ে খেললেই পারতো'।
মনে মনে চার অক্ষর বলে টিভিটা অফ না করে দিয়ে কি ওয়েট করেছিলেন সেদিন? গ্রীক ট্রাজেডির মতন লাস্ট সিনে ম্যান অব দ্য ম্যাচটা তো শচীন-ই পাবেন আর পরের দিন হেডলাইনে বেরোবে, India snatched defeat from the jaws of victory. তাহলে সবুর করুন, মেওয়া না ফলুক, গবার ভবিষ্যৎবাণী অবিশ্যি ফলবে ...

নরেন্দ্রপুরে যাঁরা পদধূলি বা কোমল খুলি কোনো একটা বিলিয়ে গেছেন, তাঁদের কাছে আর ভেতরের বর্ণনা দেওয়া বাহুল্য, আর যাঁরা সেমুখো হননি এজীবনে, তাদের কাছে বলে শেষ করা যাবে না, তবু চেষ্টা করতে দোষ নেই - মেইন গেট দিয়ে ঢুকে ডাইনে-বায়েঁ-আর সিধে তিনদিকেই যাওয়া যায়।
যদি সোজা হাঁটেন, তাহলে কলেজ, স্কুল, একটা নালা, নালার উপরে ব্রিজ, এসব পেরিয়ে একের পর এক কলেজের হস্টেলঃ  ব্রম্ভানন্দ, গৌরাঙ্গ আর সবশেষে রামকৃষ্ণানন্দ, আমার নরেন্দ্রপুরের জীবন প্রায় পুরোটাই ওই "যে জন আছেন মাঝখানে" তার কাছেই. .. অর্থাৎ গৌরাঙ্গ ভবন এবং তার একতলা, দোতলা আর মধ্যিখানের চাতাল।

আর কিছু গল্প রয়েছে ঐ ডানদিকের রাস্তাটায় মিশে, যার আদরের নাম 'এক বিড়ি পথ' - সত্যি সত্যি রাস্তাটার এমুখে একটা বিড়ি ধরালে, ওমুখ অব্দি সে আপনার সঙ্গ দেবে, আর ঝড়বৃষ্টির রাতে সব আলো নিভে গেলে যদি ওই রাস্তায় পায়চারি করেন, বিড়ির সঙ্গে আরো কিছু, আরো কেউ ...
আমার বন্ধু সন্দীপ বলতো, ওকে নাকি রোপন-দা* বলেছেন, ওঁরা ঠিক পিছনে পিছনে আস্তে আস্তে হাঁটেন এই সব অন্ধকার রাত্রে। সবসময়েই মনে হয় এই বুঝি পেরিয়ে গেলো কেউ, হয়তো এক ঝটকায় পেছনে তাকালেই তিনিও চমকে যাবেন, কিন্তু তাকানোর সাহস আজ-ও হয়ে ওঠেনি, সত্যি ...

তো মাধ্যমিকের ছুটি ফুরোলো, আর উদভ্রান্ত সেই আদিম দিবসে হঠাৎ একদিন বগলে পুঁটলি নিয়ে পৌঁছে গেলাম হোস্টেলে, দেখলাম সে এক দুরন্ত জায়গা, এক-একটা ঘরে চারটে বিছানা, চারটে করে আলমারি আর অজস্র ইরোডভ, এইচ-সি-ভার্মা, দত্ত-পাল-চৌধুরীরা গড়াগড়ি খাচ্ছেন। কোনো কোনো ঘরে স্কুলের চোখা ছেলেরা দাপিয়ে শক্ত প্রব্লেম নামাচ্ছে, আর কয়েকটায় সদ্য বাড়ি ছেড়ে আসা ধেড়ে খোকারা হাপুস নয়নে কাঁদছে ...

এসব কান্নাকাটি আর আই-আই-টির ধাক্কা সামলে বুঝলাম, হঠাৎ লাইফ পালটে গেছে, যা আগের ষোলো বছরে ছিলো না, পরের ষোলোয় তো আরোই থাকবে না, সেই ডিসিপ্লিন এলো জীবনে। জীবন মানে তখন "চারিদিকে মোর একি কারাগার ঘোর" আর সকাল-বিকেল গগনবিদারী একটি করে ঢং - সেটা শুনে ধুতি-ফুতি সামলে কাকভোরে "খন্ডণ ভব" করতে ছোটো, আর সন্ধ্যেয় মাইক্রোস্কোপিক মাছভাজা আর অড়হর ডাল খেতে। বিকেলে পাওয়া যেতো ধুলো বিস্কুট আর মাঝেসাঝে মুড়ি-ঘুগ্নি - সে আবার এমনি ঘুগ্নি নয়, কপাল খারাপ থাকলে তাতে শুধুই মান্ডেন মটরডাল, আর খুলে গেলে সে এক ভূমধ্যসাগর, এক সিনিয়র একবার পাতে একটা পোড়া বিড়ি পেয়ে খুব দুঃখ করে বলেছিলো, "আলাদা করে দিলে দুটোই খেতাম, একসাথে কেনো দিলেন দাদা?"

দাদা মানে অরুণদা, ভালো নাম আগা খাঁ, হপ্তায় একদিন মাংসের বাটি আর বুভুক্ষু জনতার মাঝে যিনি সাদা বেম্মচারীর ড্রেস পরে দাঁড়িয়ে বলবেন, 'কই, মন্ত্র দাও'**, তিনিই আগা। আগা আসলে অনেকটা জুজুর মতন, তফাৎ এই যে একটা বয়েসের পরে আর জুজুর ভয় লাগে না, আগা-র লাগে ...

আর ভয় লাগে কিছু সত্যদার থাপ্পড়ের, ওরেব্বাস সে কি জোর মাইরি লোকটার হাতে! আমাদের সময় নিয়ম ছিলো প্রেয়ারের সময় দেরি করে পৌঁছলে হয় রেকর্ডবুকে উঠে যাবে বা গার্জেন কল হবে, তো একদিন দেরি হচ্ছে দেখে যেই না উল্টোদিকে ফিরেছি, দেখি হোস্টেলের দিক থেকে কট্মট করে এগিয়ে আসছেন সত্যদা ... আমার স্থির বিশ্বাস সেইদিন ডানগালে ওই বিরাশি সিক্কার চড়টা খেয়ে যে মাথাটা কিঞ্চিৎ লেফট লিবেরাল হয়ে গেছিলো, আজ-ও পুরোপুরি সারেনি ...

সত্যদার সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড ছিলেন গবা মহারাজ, নরেন্দ্রপুরের গল্প হবে, গবা আসবেন না, এ যেন ইন্ডিয়া টিম ব্যাট করতে নামছে আর শচীন বললেন আজ গা-টা ম্যাজম্যাজ করছে, বা পুজোবার্ষিকী আনন্দমেলা বেরুলো, কিন্তু শীর্ষেন্দু মাইটোসিস আর মিয়োসিসের তফাৎ নিয়ে রচনা ফেঁদে বসলেন।
আমাদের এক সিনিয়র গুরুচন্ডালির ব্লগে লিখেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দের পরে সবথেকে বিখ্যাত সন্নিসী গবা, খুব একটা অত্যুক্তি নয় সেটা !

গবার নাম কেন গবা তা কেউ জানেনা, ওনার বয়েসও যে কি করে ওই এক জায়গায় গিয়ে আটকে গেছে, তা-ও না, ওই ইস্টার আইল্যান্ড বা বারমুডা ট্র্যায়াঙ্গলের মতোন। অনেকে বলে, ভগবানে র 'ভ' আর 'ন' কেটে গবার আবির্ভাব, তবে এর সত্যাসত্য যাচাই করা আমার সাহসের বাইরে ... তবে হ্যাঁ তিনি ফোক লিজেন্ডের মাথায় বাড়ি, তাঁর সব গল্প করতে গেলে অবশ্য এ লেখা আর শেষ হবে না, তবে দু-এক পিস না বললে বেম্মপাপ হবে, যদিও সবকটাই এদিক-ওদিক থেকে হাওয়ায় ভেসে আসা বা কুড়িয়ে পাওয়া, নিজের চোখে দেখা নয় !

নরেন্দ্রপুর একটু ঝড়বাদলা হলেই সব আলো নিভিয়ে এক্কেরে নিঝুমপুরী হয়ে যেতো, আর যেই আলো নিভতো হোস্টেলের ব্যালকনি থেকে শয়ে শয়ে পোলাপান কোরাসে চিল্লাতো, 'গবা আলো দে, গবা আলো দে' ... সে এক অতিপ্রাকৃত দৃশ্য ! এক সিনিয়রের গল্প শুনেছি, একবার নাকি আম্রিগার এক সিনেমা হলে আলো নিভে যাওয়ায় পুরোনো অভ্যেসে ভুল করে চিল্লে ফ্যালেন, 'গবা আলো দে' বলে, অমনি পিছন থেকে স্পষ্ট বাংলা গলায় ভেসে আসে, 'আমি নাইন্টি টু-এর ব্যাচ, আপনি?'

এমনও গপ্পো শুনেছি যে, গবার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নাকি একবার এইরকম-ই এক লোডশেডিং-এর রাতে মাথায় বালতি চাপা দিয়ে কয়েকজন দুষ্কৃতী ছাত্র দুই-ঘা কষায়, নিজের মুণ্ড বালতির তলায় তাই ছাত্রদের মুখ দেখতে না পেয়ে মহারাজ হুমকি দেন, যার বালতি তার কপালে টিসি নাচছে! বিধাতার কি পরিহাস, আলো এলে দেখা গেলো বালতিটাও গবার-ই ...

আর একবার নাকি এক জাপানী ভিজিটর নরেন্দ্রপুরে এসেছেন, তাঁকে লাঞ্চে আপ্যায়ণ করে খাওয়াতে নিয়ে গেলেন সত্যদা আর গবা, এটাসেটা খাওয়ার পর দই এলো। জাপানী অতিথি যাতে এই সুবর্ণ সুযোগ হাতাছাড়া না করেন তাই গবা মহারাজ দই নিয়ে যারপরনাই পীড়াপীড়ি শুরু করলেন - তাতে অতিথি খানিক উৎসাহ বোধ করে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন জিনিষটি কি? গবা মুখ উজ্জ্বল করে বললেন, This is spoiled milk, বলেই বোধহয় অতিথির মুখের দিকে চেয়ে খেয়াল হলো হেব্বি ছড়িয়েছেন, তাই তড়িঘড়ি নিজেকে সামলে বললেন, 'না রে বাবা এটা Intentionally spoiled milk ..'

(যতই  মশকরা করি, এ ব্যাপারে আমার সত্যিই একটা গর্বের জায়গা আছে, গবা মহারাজ সন্নিসী হওয়ার আগে যে স্কুলে তরুণকান্তি দে হয়ে  দশ-দশটা বছর কাটিয়েছেন, আমিও সেই বরানগর মিশনের বাই-প্রোডাক্ট !)

আমাদের সময় ইলেভেন-টুয়েল্ভ ছিলো কলেজে, আর ক্লাস নিতেন হরেক রকমের মজার লোক, আর তাদের ডাকনামগুলোও দারুণ, HKC হয়ে গেলেন হিরণ্যকশিপু, আর BKS, বকাসুর ... আর কিছু ছিলেন বহুমুখী প্রতিভা, কেমিস্ট্রি ক্লাসে প্রথম দিন-ই এসে বেঞ্জিন রিং দেখিয়ে যিনি আমার বাপের নাম খগেন করে ছেড়ে দিলেন, একদিন লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখি সেই সন্তোষ মাজীর একটা আস্ত কবিতার বই - বাংলা পড়াতেন দুইজনায়, গোবিন্দ-স্যার আর প্রণব-স্যার, অর্থাৎ পেনো ... পেনোস্যারেরও একটা গল্পের বই ছিলো, তাতে আবার দুষ্টু ছেলেরা হাল্কা উত্তেজক জায়গাগুলো আণ্ডারলাইন করে রাখতো, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ... বইটার নাম মনে পড়ে না, তবে তার একটা গল্পে অমর একটা স্লোগান ছিলো, সেইটে গেঁথে আছে ভিতরেঃ "নেশার খেয়ালে, মুতেছে দেওয়ালে' ...

অঙ্ক করাতেন বিজয় বেরা, পি এস এম আর ননী-দা, দারুণ লোকজন সব, শেষের জনের উপর সত্যি বলতে দশ নম্বরের নামকরণের সার্থকতা লিখে ফেলা যায় চাইলেই। বিজয়বাবু অসম্ভব ভালোমানুষ, আমরা ভুল করলে উনি-ই লজ্জা পেয়ে যেতেন, আর পিএসএম একেবারে যাকে বলে tour de force, শক্ত শক্ত অঙ্ক ওনাকে দেখলে চুপচাপ নিজেরাই QED লিখে বসে থাকতো ... আর ছিলেন ইংরেজী স্যার সতীপ্রসাদ মাইতি, নিশ্চিন্তে লাস্ট বেঞ্চে বসে ঢুলছি - হঠাৎ তুলে বললেন বানান করো তো ম্যানুএভর ... আমি তো ইদিকে বাংলা মিডিয়াম, প্যান্টে হেগে একশেষ ...

পাশ থেকে ছোট্ট চিরকুটে কোনো কোনোদিন চলে আসতো শক্ত বানানগুলো, কখনো পরীক্ষার হলে অরগ্যানিক কেমিস্ট্রির ফরমুলা, একবার অঙ্ক পরীক্ষায় বন্ধুকে একটা গোটা ইন্টিগ্রেশান দায়িত্ব নিয়ে টোকালাম, সে বেরিয়ে বললো, সব-ই বুঝলুম, খালি ওই পাশে চাউমিনের মতন কি একটা একেঁ গেলি সারা পাতা জুড়ে ওইটা বুঝিনি, বাকিটা দাঁড়ি-কমা শুদ্ধু টুকে দিয়েছি ...

কোনো-কোনোদিন পড়াশুনো মুলতুবি থাকতো, সে বিকেলগুলো বড়ো মায়াময় হতো, এক একদিন অনি বা সৌম্যর সাথে বসে কবিতা পড়তে পড়তে ভাবতাম প্রেম বোধহয় শঙ্খ ঘোষের কবিতা, হয়তো বিপ্লবও তাই - একদিন সন্দীপ এসে বলতো চল রাজপুরের কালিবাড়ি নিয়ে যাবো, সন্ধ্যে ছটায় আরতি হবে - একটা এইটুকুনি ছেলে ঢাক বাজায় আর তার আওয়াজ এক মাইল দূর থেকে স্পষ্ট শোনা যায় ...

একটা দারুণ বন্ধু ছিলো, শুভ্রকান্তি - অনেক অনেকদিন পরেও তার চিঠি আসতো আমার ঠিকানায়, সে লিখতো গরমকালে কেমনি দামোদর নদের জল শুকিয়ে গেলে হেঁটে হেঁটে পেরিয়ে যাওয়া যায়, আর আমিও লিখতাম তাকে, ঘোর বর্ষায় আমার বাড়ির পাড়াই কেমন দামোদর হয়ে যায়, আর বাবা কেমন সকালে উঠে ইঁট পেতে দেন যাতে ইস্কুলের জুতোটা না ভিজে যায় গলিটা পেরোতে গিয়ে ...

আমাদের ইস্ট উইং-এর একদম শুরুর ঘরটায় থাকতো অরিজিৎ আর দেবাঞ্জন, মাঝে মাঝে বসতো আড্ডা আর অন্তাক্ষরী - বানিয়ে টানিয়ে ভুজুং-ভাজুং দিয়ে গান মিলিয়ে দারুণ হতো ব্যাপারটা ... সেই একবার তো আমি, রবিরঞ্জন আর সুদীপ্ত একটা গান-কুইজ প্রায় জিতেই গেছিলাম, লাস্ট রাউন্ডে জিজ্ঞেস করলো বাংলাদেশের একটা আধুনিক গান গাও (নাঃ, আমার সোনার বাংলা গাইলে হবে না), তখন কোথায় আয়ুব বাচ্চু, কোথায় এল আর বি আর জেমস, আমরা তো হতাশ হয়ে পাস করে দিলাম - ওমা, পাশের টিম দেখি লজ্জাঘেন্নার মাথা খেয়ে শুরু করে দিলো আজগুবি একটা গান, 'সাতদিন এক হপ্তা, বারোদিনে মাস, তিনমাস পর এগজামেতে, টিচার দিলো বাঁশ' ... তুমুল আপত্তি সত্ত্বেও জাজদের সেইদিন মানতে হয়েছিলো, যে কোনো জিনিষের Existence disprove করা ভয়ানক কঠিন, সে নিরাকার ঈশ্বর -ই হোন বা বাংলাদেশী র‍্যাপ ...

ভয়ানক দুষ্টূ ছেলে ছিলো জ-বাবু (আসল নামটা চেপে গেলাম, সে এখন একটা সফল স্টার্ট-আপের সি-ই-ও), পেনো-গোবিন্দো তো এসেই তাকে বের করে দিতো, তাও জ-বাবু ঠিক টাইমে পৌঁছে যেতো ক্লাসে, এক একদিন আবার একগাছা জংলা ফুল থান ইঁট দিয়ে চাপা দিয়ে রাখতো স্যারের টেবিলে, "ভিতর থেকে" সরি বলবে বলে ... একদিন গোবিন্দো-স্যার ক্লাসে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়াচ্ছেন, হঠাৎ জ-বাবু সামনের বেঞ্চ থেকে বলে উঠলো, 'স্যার জয়েন্টের সাজেশান দিন' ... গোবিন্দ-দা হেব্বি খচে গিয়ে বল্লেন, 'হয় তুমি ক্লাসে থাকবে, নয় আমি', জ-বাবু সাজা শুনলো, আস্তে আস্তে উঠে ক্লাসের দিকে ফিরে বললো, 'তোরা তো শুনলি, স্যার বলেছেন, হয় স্যার থাকবেন, নয় আমি থাকবো, এবার তোরা বল, তোরা কি চাস?'

আরো কত্ত-কত্ত মজার গল্প, রাত কাত হয়ে যাবে লিখতে লিখতে, এই এতোদিন পরে লিখতে বসে নিজেই একচোট হেসে নিলাম সেসব ভেবে ভেবে, আর মনটাও বেশ ফুরফুরে হয়ে গেলো, মনে হলো যেনো শীতের ছুটি পড়েছে, সেই এক-বিড়ি পথটায় হাঁটছি পুরোনো বন্ধুদের সাথে, হাতে একটা ব্যাট আর ক্যাম্বিস বল, আর কদিন পরেই টেস্ট পরীক্ষা, তারপর জয়েন্ট, সব্বাই কে কোথায় ছিটকে যাবে কেউ জানে না, কিন্তু কিছুই যায় আসে না, আজকে জমিয়ে খেলা হবে, আর সন্ধ্যেবেলায় মহামায়াতলার দোকানটায় শেয়ার করে এগরোল, বা গড়িয়া মোড়ের রাঁদেভুতে গিয়ে তড়কা-রুটি।

একজন দুজন তবু পাশে থেকে যাবে, বড় ক্লান্ত হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালেই জানি অরিজিতের একটা ফোন আসবে এক্ষুনি, বা ইনবক্সে অনির একটা সদ্য হাতে লেখা কবিতার ছবি এসে বলবে, 'আমার চিঠিটা কবে আসবে, হাবু?'

আমিও এসব ভাবতে ভাবতে, সেই স্মৃতিগুলোর সাথে আড্ডা মারতে মারতে ফিরে যাই সেই শীতের দুপুরগুলোয়, পা ছড়িয়ে বসি একটা পুরোনো পুকুরের পাড়ে, আর এই  রংলাগা রোদ্দুরটায় আমাদের কি যেন একটা হয়ে যায়!